Total Pageviews

Monday, 9 August 2021

জল, পানি, জলপানি

 

জল, পানি, জলপানি

মৌসুমী বিলকিস


জল (<সংস্কৃত জল) নাকি পানি (<সংস্কৃত পানীয়)? সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে প্রবল তর্ক। এক দল বলছেন, জল বাংলা শব্দ, পানি মোটেও বাংলা নয়, আরবি বা ফারসি, এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা তা ব্যবহার করে না। আর এক দল ঝাঁপিয়ে পড়ে পানির বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় করছেন। এই আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণ সময় সময় শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছে এবং হাস্যকর ও ভয়ংকর কিছু ভুলভাল তথ্য ও মন্তব্যে ভরে উঠছে অন্তর্জাল। এর মধ্যে সাম্প্রতিক গৈরিক বা সবজে ট্রেন্ড-ও যে সুপ্ত নেই, একটু চোখকান খোলা রাখলেই মালুম হবে। এ সব দেখে লালনের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে, ‘জলের উপর পানি না পানির উপর জল?’ কবি, চলচ্চিত্র পরিচালক মাসুদ পথিক ‘জল ও পানি’ কবিতায় এই প্রশ্নটিই উসকে দেন, ‘মনে মনে ভাবি, এই কান্নায় কি ঝরে বেশি জল না পানি?’ সোহেল রানা বয়াতি এই কবিতা অবলম্বনে তাঁর সমনামের শর্ট ফিল্মে পর্দা‌বন্দি করেন জল ও পানির দ্বন্দ্ব বিষয়ক অমোঘ সব প্রশ্ন। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের সদস্য নবীন ভারতীয় ভাষাগুলি দিব্যি ‘পানি ব্যবহার করে (হিন্দি, ওডিয়া, বাংলা, গুজরাতি, মরাঠি, অসমিয়া ইত্যাদি)। কিন্তু এই জল ও পানি নিয়ে ছুঁতমার্গ ঠিক কবে থেকে শুরু হল বাংলায়? 

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদে দেখি, ‘তেন ন চ্ছুপই হরিণা পিবই ন পাণী। (ভুসুকপা)। বড়ু চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন-এ এই দুই শব্দ পাশাপাশি ব্যবহার করেন, ‘তোহ্মার বোলে কেহো কাহ্নাঞি না বহিব পাণী।/ উচিত নিফল হৈব তোর জল ভাবি বুঝ চক্রপাণী।। (যমুনাখণ্ড)। তিনি অজস্র বার পাণী (বা পাণি) ব্যবহার করেছেন জল, পানীয় বা বৃষ্টির প্রতিশব্দ হিসাবে (এখনও মুর্শিদাবাদের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কথায় পানি=বৃষ্টি। ‘রোদ হচে পানি হচে/ খ্যাক শিয়ালের বিহে হচে।)। 

মধ্যযুগের কবিরা অবলীলায় চয়ন করছেন এই দুটি শব্দ। চণ্ডীমঙ্গলে পাচ্ছি, বিরহ-জ্বরে পতি যদি মরে/ কোন ঘাটে খাবে পাণী/ কাঁখে হেমঝারি মেনকা সুন্দরী/ জল সাধে ঘরে ঘরে (কবিকঙ্কণ)। চৈতন্যমঙ্গলে, ‘এ বোল শুনিয়া পুনঃ প্রভু বিশ্বম্ভর। কান্দয়ে দ্বিগুণ ঝরে নয়নের জল।। এবং ‘মুখে নাহি সরে বানী/ দু নয়নে ঝরে পানি...’ (লোচনদাস)। এমনকী সৈয়দ আলাওল, যাঁকে আপামর বাঙালি ‘মুসলমান কবি হিসাবেই চেনে, তিনিও ‘জল ব্যবহার করছেন। ‘শীর্ষের সিন্দুর নয়ানের কাজল/ সব ভাসি গেল জলে। বা ‘না ভিজয় জলেত অগ্নিত না পোড়য় (পদ্মাবতী)। খনার বচনে এই দুটি শব্দেরই ব্যবহার আছে, ‘খনা বলে শুন হে স্বামী/ শ্রাবণ ভাদরে হবে না পানি এবং ‘রান্ধি বাড়ি যেবা নারী পুরুষের আগে খায়/ ভরা কলসীর জল তার তরাসে শুকায়।। অন্য দিকে লোকসাহিত্য যখন যেটা জুতসই মনে করেছে, তখন সেটা ব্যবহার করেছে। ‘থির পানী পাথর সয় এবং ‘জলেই জল বাধে; ‘হাতি ঘোড়া গেল তল/ মশা বলে কত জল; ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি; ‘জানি কাজ পানি; ‘ধন জন জোয়ানী/ কচু পাতার পানি। এখনকার সাহিত্যিককুল দুটি শব্দই ব্যবহার করেন ঠিকই, কিন্তু কোন শব্দটি বেশি ব্যবহার করছেন তা তাঁর বেড়ে ওঠার চর্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত অবশ্যই।

এখন ধরা যাক, এক দল চাইছে শুধু জল শব্দটি, আর এক দল পানি। তা হলে এই দুই শব্দজাত অন্যান্য শব্দগুলির কী দশা হবে? জলপানি (বৃত্তি) কী দাঁড়াবে? জলজল বা পানিপানি? জলখাবার হয়ে যাবে পানিখাবার? জলপাই হবে পানিপাই, জলবায়ু হবে পানিবায়ু, আদাজল দাঁড়াবে আদাপানি-তে? 

আরও কতকগুলো শব্দের হদিশ নেওয়া যাক। জলচল (পানিচল?), জলজ (পদ্ম। পানিজ?), জোলো (??), জলীয় (পানীয়? সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ), পানিফল (জলফল? যদিও সংস্কৃতে জলফল শব্দটি আছে কিন্তু বাংলা ভাষা শব্দটি গ্রহণ করেনি), পানতা (<পানিতা<পানি+তা। জলতা?), পানকৌড়ি (পানি(নী)+কৌড়ি(ড়ী); জলকৌড়ি?), পানসে (<পানসা<পানিভাসা। জলসা/সে?), পানা (<পানি+আ। সরবত, জলের উদ্ভিদ। জলা/জালা?) 

যে কোনও ভাষা কোনও শব্দ গ্রহণ করবে নাকি করবে না, তার নিয়মকানুন আছে, পণ্ডিতরা বলেন। বাংলায় ‘জল বা ‘পানির বহু প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও দুটি শব্দই প্রচলিত। শুনেছি বিখ্যাত এ-পার বাংলার লেখকদের লেখা থেকে ‘জল কেটে ‘পানি বসিয়ে বই পাইরেসি হয় ও-পার বাংলায়। এ-পারে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে দাদি, নানি, ফুপু শব্দ যোগ হওয়াতে হইহই হয়। কিন্তু কাদের সন্ততিরা পড়ে এই সব স্কুলে? যাঁরা দাদি, নানি, ফুপু শব্দগুলি ব্যবহার করেন, তাঁদের সন্তানরাই এই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটা বড় অংশ। গবেষকরা দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠী হিন্দু জনগোষ্ঠীর একেবারে নীচের তলার বাসিন্দা ছিল (কজনই বা বিদেশি মুসলিম এসেছিলেন আর থেকে গিয়েছিলেন বাংলায়?)। তাঁদের ওপর জাতপাত-সংক্রান্ত অত্যাচারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অন্য দিকে, ক্ষমতায় থাকা মুসলিমরাও প্রজাদের খুব আদর-যত্নে রাখতেন বলে মনে হয় না। 

গোপাল হালদার ব্যাখ্যা করেছেন, ক্ষমতা ও সংস্কৃতির শীর্ষে থাকা মুসলিমরা আরবি, ফারসিতে লেখাপড়া বা সাহিত্যচর্চা করেছেন। অন্য দিকে নিচুতলার মুসলিমরাই মৌখিক সাহিত্য (যেহেতু তাঁরা ইশকুল অবধি পৌঁছতে পারেননি)এবং পরে কিছু কিছু লিখিত সাহিত্যের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় অবদান রেখেছেন ('বাঙালী সংস্কৃতির রূপ')। মধ্যযুগের সব কবিরাই যখন জল ও পানি ব্যবহার করছেন, তখন কি সিদ্ধান্ত করা যায় ঔপনিবেশিক বাংলা এই বিভাজনের ভিত সৃষ্টি করেছিল? সিপাহি বিদ্রোহের বন্দুকের টোটা, ভারত ভাগ, বঙ্গভঙ্গ, মন্বন্তর, জাতপাত, দাঙ্গায় লুকিয়ে আছে এর বীজ? জোর করে কোনও শব্দ চালু করতে চাইলেও ভাষার নিজের মর্জি‌ বাতিল করবে অবাঞ্ছিত শব্দ। আর যে শব্দ প্রচলিত তাকে বাদ দেওয়াও সহজ হবে না, এমনকী কালের নিয়মে একটি শব্দের অর্থ পরিবর্তিত হয়ে গেলেও। শব্দের গৈরিকীকরণ বা সবজেকরণ তাই বরদাস্ত করবে না বাংলা ভাষা।

--------------------------------------------------------------------------- 

*আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তর সম্পাদকীয়, ৭ মার্চ, ২০১৮ 

*ছবি: লেখক 

 

 

Thursday, 5 August 2021

ভূস্বর্গের মেয়েটি

 

 

ভূস্বর্গের মেয়েটি

শাহনাজ বশির 

ভাষান্তর: মৌসুমী বিলকিস

 



একাধারে আপনারা এক এবং অভিন্ন ব্যক্তিই কি হতে পারেন?... সম্ভবত একজন নারীকে তার ব্যক্তিত্বের স্বরূপের ভেতর খুঁজলেই মঙ্গল। - ইঙ্গমার বার্গম্যান, পারসোনা

 

আমার জীবনে এমন কখনো ঘটেনি। কখনো না। যাকে বলা যেতে পারে, অস্বাভাবিক। বা এমন একটা ঘটনা যা আপনাদের অভিজ্ঞতায় সম্ভবত নেই। সেরকমই এক বিরল কাহিনি শুরু করতে চলেছি

নব্বই দশকের শুরুর দিক। আমি একটি মুদিখানার দোকান চালাই। জহর নগরের বিখ্যাত খান সোজর্ণের দোতলা খালি পড়ে আছে বাড়িটা সংযোগ রাস্তার মুখোমুখি। একেবারে আমার দোকানের উল্টোদিকে। একটি নতুন ভাড়াটিয়া পরিবার এলো দোতলায় শ্রীনগর শহরের লালচক ব্যবসায়িক কেন্দ্র থেকে কম দূরত্বের কারণে জহর নগর তখন একটা উঠতি গঞ্জ এলাকাকাশ্মীরের দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে মানুষজন এখানে ভাড়া থাকতে আসে গ্রামে গ্রামে বিদ্রোহীদের সক্রিয় গতিবিধি এবং প্রায়শই তারা সামরিক বাহিনীর রাইফেলের নিশানা শহরের অবস্থাও এমন কিছু ভালো নয়কিন্তু তবুও শহর সবসময় সংবাদ মাধ্যমের নজরের আওতায়সব থেকে বড় কথা ছাত্র, সরকারি কর্মী, নিষিদ্ধ রাজনীতিক, এমনকি গ্রামের পলাতক বিদ্রোহী সবার আকর্ষণের কেন্দ্র এই শহর।

বলা প্রয়োজন যে এই এলাকায় যারা ভাড়াবাড়ি খোঁজে তাদের সাহায্য করার বিষয়ে আমার বেশ নামডাক এলাকার ভাড়াবাড়ি এবং খালি ঘরের সমস্ত খবর আমার জানা ভাড়া সংক্রান্ত খুঁটিনাটি, পরিবর্তিত সুযোগ সুবিধা, চুক্তির নিয়ম কানুন এবং বাড়িওয়ালার মেজাজ মর্জি আমার নখ দর্পণে। বলা যায়, আমি আশেপাশের এলাকার বিশ্বস্ত অভিভাবক। এমনকি কিছু কিছু ফ্ল্যাটের চাবিও রাখিবড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ি; যেমন ইউসুফ ভিলা, ভাট কটেজ, খান সোজর্ণ এবং এরকম আরো অনেক বাড়িরই চাবি থাকে আমার কাছেপ্রায় সব বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া আমার বাঁধা খদ্দের কিছু ভাড়াটিয়া বছরের পর বছর ভাড়া থাকে। কেউ থাকে বেশ কয়েক মাস। আবার কেউ মাত্র কয়েক মাসের জন্যকেউ কেউ আবার না জানিয়ে ফ্ল্যাট খালি করে চলে যায় এবং আমার কাছে তারা ঋণ খেলাপিই থেকে যায়, যেহেতু আমার দোকান থেকে ধারে মালপত্র কিনেছে আবার আমি অনেকের পারিবারিক বন্ধুও হয়ে উঠি এমনকি অনেক ভাড়াটিয়া ঘর ছেড়ে দেওয়ার পরেও তাদের সঙ্গে বছরের পর বছর বন্ধুত্ব থাকে কিছু কিছু পারিবারিক বন্ধুত্ব গভীর হয়ে ওঠে একমাত্র সেরকমই কয়েকজন এখনো, এই শহরে নেমে আসে আমার ও আমার শয্যাগত স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতেকিন্তু এতজন ভাড়াটিয়ার মধ্যে জারগার পরিবারকে খুব মনে পড়ে

জারগার পরিবারের সদস্য মাত্র তিনজন; তারিক জারগার, তার স্ত্রী আয়েশা এবং তার বৃদ্ধা মা যার নাম আমি জানি না, শুধু জানি যে তাঁকে সবাই ‘আপাজি’ বলে ডাকেক্রমশ জানতে পারি তারিক ও আয়েশা পাঁচ বছরের বিবাহিত এবং তারা এখনো একটি শিশু সন্তানের বাবা-মা হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ওরা খান সোজর্ণের দোতলা ভাড়া নিয়েছিলো। আমার ঠিক মনে নেই, সালটা ১৯৯১ নাকি ১৯৯২। কিন্তু মনে পড়ে সেটা নব্বই দশকের শুরুর দিক এবং ফেব্রুয়ারি মাস।

                তারিক মাঝারি উচ্চতার মোটামুটি স্বাস্থ্যের অধিকারি আর খুব সুন্দর দেখতে মুখ ফ্যাকাসে হলেও সপ্রতিভ, সুন্দর করে ছাঁটা চৌকো দাড়ি এবং একদিকে সিঁথি করে আঁচড়ানো চুল। ওর ডান পায়ে যে জন্মগত সমস্যা আছে সেটা বুঝতে আমার এক মাস লেগেছে হাঁটার সময় ডান পা এক ঝটকায় তুলতে হয় তাকে কিন্তু তার স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্ব এইসব ছোটখাটো ত্রুটি আড়াল করে রাখেসবচেয়ে স্মরণীয় সেই প্রানবন্ত হাসি যা তার ঠোঁটে সবসময় ঝুলে থাকেতারিক জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। দক্ষিণ কাশ্মীরের ইসলামাবাদ জেলার নিজের গ্রাম থেকে স্থানান্তরিত হয়ে সে এই জহর নগরে এসেছে। নিজের শহরের খারাপ পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে সে এখানে স্থানান্তর নিয়েছে, যে পরিস্থিতি সামলাতে সেও একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছে এতদিন তার পোস্টিং হয়েছে কর্মরত ব্যাঙ্কের লালচক শাখায়।

আয়েশা সুন্দরী, ফর্সা, নম্র, আধুনিক এবং শিক্ষিত। বিয়ের অনেকদিন আগেই একটা পথ দুর্ঘটনায় মা বাবাকে হারিয়েছে তার ছোট বোন দক্ষিণ কাশ্মীরে থাকে। ওখানে এক স্থানীয় কনট্রাক্টরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে আর এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে তার স্বামী কাজ হারিয়েছেআয়েশার সঙ্গে বিয়ের কিছুদিন পরেই তারিকের বাবা ফুসফুসের কর্কট রোগে মারা যায়। বড় দুই ভাই তার ও তার মায়ের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় তারিক ও আয়েশার সম্বন্ধ করে বিয়ে হলেও ওদের দেখে মনে হয় ওরা যেন শৈশব থেকেই পরস্পরকে ভালোবাসতো।

                      ওদের সঙ্গে আমার সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠতে লেগেছে মাত্র কয়েকদিনতারিক আমাকে ‘হাজি সাহেব’ বলে ডাকে। যদিও তখন পর্যন্ত আমি মক্কায় হজ করতে যাইনি যখনই সে আমার দোকানে মোমবাতি, দই, বিস্কুট, পাউরুটি, ডিম বা সিগারেট নিতে আসে তখনই আমরা তার গ্রামের অশান্তি বা শহরের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলি

ওদের ফ্ল্যাটের বারান্দার একেবারে মুখোমুখি আমার দোকান। ওদের গতিবিধি দেখে বুঝি ওরা সত্যিকারের জোড়। ওদের মতো চমৎকার স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক দ্বিতিয়টি দেখিনি। এক সময় আমার দৃঢ় ধারণা হয় যে এই এলাকায় ওরা দুজন ভালোবাসার আদর্শ দৃষ্টান্ত। ক্রমে ক্রমে আশেপাশের এবং খান সোজর্ণের একতলা ও তিন তলার ভাড়াটিয়া স্বামী-স্ত্রীরা তাদের খুঁটিনাটি খেয়াল করতে শুরু করে এবং পরস্পরের ঝামেলায় নিজেদের মধ্যে প্রেমের অভাব বোঝাতে হামেশাই তারিক ও আয়েশার দৃষ্টান্ত টেনে আনে

আয়েশা আমাকে বাবার মতোই শ্রদ্ধা করে এমনকি আমার নিজের ছেলেমেয়েদের থেকেও বেশিই শ্রদ্ধা করেপ্রত্যেক সকালে সে বেরিয়ে আসে বারান্দায়রেলিঙের ওপর ঝুঁকে সে আমাকে সালাম জানায়, আমার পরিবারের কুশল জিজ্ঞেস করেতারপর উবু হয়ে বারান্দায় বসে স্বামীর কালো জুতো পালিশ করে, উজ্জ্বল করার জন্য এক ফালি রোদের ভেতর দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখে জুতো জোড়া তারিক হয়তো তখন ঝুড়ি চেয়ারে বসে একটা উর্দু সংবাদপত্রের আড়ালে তার শরীরের ঊর্ধ্বাংশ আড়াল হয়ে আছে সিগারেট ফুঁকছে সে। পায়ের ওপর পা তুলে খচমচ শব্দ করে কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছে। কিছু পরেই হয়তো রান্নাঘরের দরজা ভেদ করে ভেসে আসছে খুন্তি নাড়ার শব্দ, ভাজাভুজির আওয়াজ আর প্রেসার কুকারের হিস্‌স্‌। ওমলেট ভাজার গন্ধ বাতাসে ভর করে রাস্তা পেরিয়ে আমার দোকানে পৌঁছে যাচ্ছেএক ঘন্টা বাদে আয়েশা বারান্দায় বেরিয়ে আসে এবং রোদ খাওয়া জুতোগুলো আবার বেশ কড়া করে পালিশ করে। প্রায় দিন তারিককে দেখা যায় গাঢ় নীল স্যুট পরে, হাতে ব্রিফকেস নিয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি। আয়েশা তাকে জুতো পরাতে যায় আর তারিক সবসময় আপত্তি করে। গোঁ ধরে যে নিজের জুতোর ফিতে সে নিজেই বেঁধে নেবে এবং আয়েশা কোনোভাবেই তার অভ্যাস নষ্ট করতে পারবে না। কিন্তু আয়েশা সেসব পাত্তা না দিয়ে জুতোর ফিতে বেঁধে দেয় আর তারিক সারাক্ষণ পা সরিয়ে নিতে নিতে হাসে। আয়েশাও হেসে ফেলেএটা এমন একটা খেলা যাকে বলা যায় ‘এসো, পারো তো আমার জুতোর ফিতে বাঁধো’। আয়েশা তার একটা পা চেপে ধরে পায়ের পিছনে চিমটি কেটে হাসেতারিকও হাসে শব্দ করেএক হাতে বেড় দিয়ে এক পা ধরে থাকে আয়েশা। তারিক পরাজিত হয়ে আবার হেসে ফেলে

                           দোকান পরিষ্কারের সময় পাউরুটিগুলো দোকানের সামনের দিকে সাজিয়ে রাখি, আলু চিপস্‌-এর প্যাকেট ভর্তি জালের ঝুড়িগুলো দোকানের বাইরে ঝুলিয়ে রাখি যাতে সহজে খদ্দেরের চোখে পড়ে। এসব করতে করতে আমি প্রায় প্রতিদিন তাদের অলক্ষ্যে এই খুনসুটি দেখি কিন্তু আমার উপস্থিতি টের পেলে তারা লজ্জা পেয়ে পরস্পরকে সচেতন করে এবং গম্ভীর হয়ে যায় আয়েশা তার ওড়নাটা অযথাই ঠিক করে আর তারিখ গলা খাকারি দেয় দুজনেই আমার দিকে তাকিয়ে অমায়িক হাসেকিছুক্ষণ পর তারিক সংযোগ রাস্তার বাঁক পেরিয়ে বড় রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেলে আয়েশা পলকহীন তাকিয়ে থাকেতারিক প্রায়ই তার মানি ব্যাগ ভুলে যায় আর আয়েশা বারান্দা থেকে আমাকে চেঁচিয়ে ডাকে অনুরোধ করে আমি যেন সিটি বাজিয়ে তারিককে থামাই। সে তখন হয়তো সবে রাস্তার বাঁক পেরিয়ে বড় রাস্তায় অদৃশ্য হতে গিয়েও থেমে গেছেআয়েশা খালি পায়েই দৌড়ে বাইরে আসে, হাতে তারিকের মানি ব্যাগ। 

          ওদের প্রেম দেখে হিংসা হয়বাড়ি গিয়ে প্রত্যেকদিন তাদের প্রেমের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিই আমার স্ত্রীকে। আশা করি এসব শুনে সে অন্তত পাল্টাবে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নাআমার স্ত্রী আগের মতোই বদমেজাজি থেকে যায় মাঝে মাঝে সকালবেলা দোকানে আসার সময় আমি হিসাব নিকাশের খাতা আনতে ভুলে যাইসন্ধ্যেয় ঘরে ফিরতেই স্ত্রী আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তিকে গালমন্দ করতে ছাড়ে না। এই নিয়ে সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে

            আয়েশার শাশুড়ি ঘরের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করেন। কালেভদ্রে তাঁকে বারান্দায় দেখা যায়তিনি হয়তো মাঝে মাঝে মিনিট পাঁচেকের মতো বারান্দার ঝুড়ি চেয়ারটায় এসে বসেন এবং পরক্ষণেই ঢুকে যান ফ্ল্যাটের ভেতরদুপুরবেলা তারিকের কাচা জামাকাপড় বারান্দার দড়িতে শুকোতে দিয়ে আয়েশা আমার দোকানে আসে সবজি কিনতে। প্রত্যেকদিন সে আলাদা আলাদা শাকসবজি কেনে। কিন্তু আলু কেনে রোজ‘রাতের খাবার যাই হোক না কেন তারিক সাহেবের ফ্রেঞ্চ ফ্রাই চাই-ই চাই। খুব ভালোবাসে কিনা।’, সে হয়তো তাজা শাকসবজি বেছে নিতে নিতে বলে

              কোনো কোনো সন্ধ্যায় মা ও স্ত্রীর জন্য কয়েকটা প্লাস্টিকের ব্যাগ ভর্তি উপহার কিনে বাড়ি ফেরে তারিক। সম্ভবত প্লাস্টিকের ভেতর জামাকাপড় ও জুতো। হয়তো খান সোজর্ণের গেটে ঢোকার আগে সে সোজা আমার দোকানে আসে সিগারেট কিনতে। হয়তো দুধ ও এক ডজন নারকেলের তৈরি মোড়কহীন খোয়া লজেন্স কিনতে চায় জার থেকে লজেন্স বের করতে করতে সে লজ্জা লজ্জা করে বলে,‘আয়েশা পাগলের মতো পছন্দ করে’

 একদিন বারান্দায় কাউকে দেখা যায় না। রান্নার শব্দ বা গন্ধ কিছুই ভেসে আসে না। আমার কৌতূহল বাড়তে থাকে। দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে করে দুশ্চিন্তা হতে থাকে। আমি দোকানের শার্টার অর্ধেক নামিয়ে খান সোজর্ণে ঢুকে পড়ি। দেখি, আয়েশা বিছানায় শুয়ে প্রবল জ্বরে ছটফট করছে। তার কপালে ভেজা কাপড় রেখে জ্বর কমানোর চেষ্টা করছে তারিকআমি কিছুক্ষণ বিছানার পাশে বসে আয়েশাকে অভয় দিই। শুনি, তারিক ক্রমাগত তাকে বলে যাচ্ছে, ‘বালা’ই লাগাই’ (তোমার জ্বর আমার হোক) বা ‘জুভ ওয়ানদাই’ (আমার জীবনের বিনিময়ে তোমার রোগমুক্তি হোক)আর প্রত্যেকবার আয়েশা লজ্জিত হয়ে ক্ষীণ গলায় উত্তর দিচ্ছে, ‘এরকম বলে না’।

আমার ভেতরে জ্বালা জ্বালা ভাব হয়। জীবনে কখনো আমার স্ত্রী আমাকে এরকম করে বলেনি। সে কখনো আমার ‘বালা’ই লাগাই’-এর প্রত্যুত্তর দেয়নি। তা সত্বেও আমি লাজুকভাবে তাকে বলেছি ‘বালা’ই লাগাই’। আমার ঠাণ্ডা লাগলে বা অসুখ করলে সে আমাকে দোষী সাব্যাস্ত করে। অভিযোগ করে যে আমি আবহাওয়া বিষয়ে সাবধান হইনি। আমাকে শাপ শাপান্ত করে যে আগেই আমার প্রয়োজনীয় সাবধানতা নেওয়া উচিত ছিল। আমার অসুখের থেকেও তার ক্রমাগত বিদ্রুপে আমি বেশি পিড়িত বোধ করি

আরো একটি বিষয়, ওরা দুজনে কারো প্রশ্নের উত্তর দেয় একই রকম কায়দায় একইভাবে সাড়া দেয়, উত্তর দেয়, মতামত জানায় বা সমাধান বাৎলায়, একই রকম শব্দগুচ্ছ, একই রকম গঠনের বাক্য বিন্যাস, একইরকম স্বরভঙ্গি এবং একই রকম অর্থ বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করি, স্বতঃস্ফূর্ত হলেও, কী নিখুঁতভাবে মিলে যায় তাদের চিন্তাভাবনা, কী নির্ভুল তাদের শব্দ প্রয়োগের সময়-জ্ঞান, তাদের মানসিক ক্রিয়ার কী সমাপতন! কম্বল বিক্রেতার কাছে তাদের দরদাম, দুধে জল মেশানোর জন্য দুধ বিক্রেতার কাছে তাদের একই অভিযোগ, আমাকে একই রকম প্রশ্ন, আমার এবং আমার পরিবারের কুশল জিজ্ঞাসা- সব বিষয়েই তাদের সাদৃশ্য

এইসব এবং আরো অনেককিছু তারিক ও আয়েশাকে অসাধারণ এক জোড়ে পরিণত করেছেকিন্তু নিয়তি বোধহয় স্বামী-স্ত্রীর প্রেম পছন্দ করে না।

সম্প্রতি শ্রীনগরে দাঙ্গা হাঙ্গামা বেড়েই চলেছে। কারফিউ, কাজকর্ম বনধ্‌, এবং সেনাবাহিনি ও বিদ্রোহীদের মধ্যে গোলাগুলি বিনিময় ক্রমাগত বাড়ছে জহর নগরের অনেক মানুষের দোকানপাট বা ব্যবসার জায়গা লাল চকনানারকম অফিস কাছারিও এই এলাকার আশেপাশে। একদিন প্রতিবেশীরা কাজ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছেতারা আমার দোকানে এসে জানায় যে শ্রীনগরের রেসিডেন্সি রোডে বেশ ভালো রকম গোলাগুলি চলেছে।

এই অসময়ে লোকজনকে বাড়ি ফিরতে দেখে আয়েশা তার স্বামীর পথ চেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারিক ফিরছে না। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এলে আয়েশা আর বারান্দায় দাঁড়াতে পারে না। ডান পায়েরটা বাঁ পায়ে, জুতো উল্টোপাল্টা প’রে নীচে নেমে আসেঅস্থির খান সোজর্ণের সামনে দাঁড়িয়েঅপলক চেয়ে থাকে রাস্তার বাঁকে। অধৈর্য হয়ে কচলায় দু’হাত অন্ধকার আরো গাঢ় হয়। আমি দোকান বন্ধ করে তার কাছে খান সোজর্ণের গেটে যাই। প্রবোধ দিই। আশ্বস্ত করি যে তারিক যে কোনো মুহূর্তে ফিরে আসবে। খানিক পরেই সে ফিরতে থাকা প্রতিবেশীদের কাছে তারিক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করে। তারা কেউই তারিককে দেখেনি। কিছুক্ষণ পর রাস্তার অপরিচিত লোকজন যাকে পায় তাকেই সে তারিকের কথা জিজ্ঞেস করে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমিও তার প্রশ্ন পুনরাবৃত্ত করি। আমি লোকজনকে বোঝাতে চাই এই জিজ্ঞাসা মোটেও অস্বাভাবিক নয়, আয়েশা সত্যিই চিন্তিত। ধূসর অন্ধকারের মধ্যে তার উদ্বিগ্ন মুখ ভালো করে দেখতে পাই না। কিন্তু এই অন্ধকারে শুকনো, ক্ষয়াটে এক মানবী মূর্তির মতো সে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে মনে হয় বেদনাহত, একাকী এবং নিরুদ্যম আমি তাকে প্রবোধ দিতেই থাকি। ভরসা দিই যে তারিক ফিরবে। তার চোখ জোড়া রাস্তার বাঁকে আটকেস্পষ্টতই তার কল্পনায় তারিকের আবছা ছায়াময় অবয়ব যে কোনো মুহূর্তে রাস্তার বাঁকে ফুটে উঠতে পারে। কিন্তু আবছা অবয়ব শূণ্য ছায়ার শরীরই থেকে যায়।

মনে আছে, তখন রাত পৌনে দশটা হবে। লালচকের রাস্তায় ফিরছে শেষতম কয়েকজন ফিরতে ফিরতে অসামরিক লোকজনের হতাহতের কথা আলোচনা করছে এবার আয়েশা নিঃসঙ্কোচে যাকে সামনে পায় তার কাছেই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানতে চায়। এর মধ্যে খান সোজর্ণের অন্যান্য ফ্ল্যাট থেকে দুজন মহিলা ও আমার স্ত্রী পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাইরে এত ঠাণ্ডা যে কথা বলার সময় মাঝে মাঝে আয়েশার দাঁতে দাঁত লেগে শব্দ হচ্ছে। তারিকের মা চুপচাপ বারান্দার গ্রিলে ঠেস দিয়ে ঝুঁকে আছেন ভালোই বুঝতে পারছেন কী ঘটেছে। কিন্তু একবারও আমাদের কিচ্ছু জিজ্ঞেস করছেন না। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে একসময় তিনি  বারান্দার এক প্রান্তে বসে পড়েন। অবিরত কাশতে কাশতে চশমা ভেদ করে একদৃষ্টে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। পরে কখনো, হতেই পারে, আমরা শুধুই সেখানে তাঁর গাঢ় কালো অবয়ব দেখবো

আমার স্ত্রী সান্তনা দেওয়ার জন্য তারিকের মায়ের কাছে চলে যায়। একজন আয়েশার শাল নিয়ে আসে। আমি আয়েশার জুতো ঠিক করে পরার ইশারা করি। এক মুহূর্তে, আমরা তিনজন; আয়েশা, খান সোজর্ণের নীচতলার ফ্ল্যাটের মহিলা এবং আমি বেরিয়ে পড়ি। টর্চের আলোয় রাতের গভীর কালো পোশাক ফুঁড়ে, বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে যাই, তারিকের খোঁজে। যাত্রাপথে, টালমাটাল হেঁটে আমরা এগোই। একমাত্র কুকুরের চিৎকার ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সব দোকানপাট বন্ধ। সব সদর দরজা তালাবন্ধ। সব বাড়ি অন্ধকার। সব জানলা বন্ধ। কিছু জায়গায়, বড় রাস্তার কাছের বাড়িগুলির জানলা ভেদ করে মানুষজনের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসেতারিকের অফিস, রেসিডেন্সি রোডে জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাঙ্কে যেতে গেলে নৌকায় করে পেরোতে হবে ঝিলম নদী। এই সময় একটা নৌকা খুঁজে পাওয়া একেবারে অসম্ভব। লাল মাণ্ডির কাছে নদীটা কিছুটা ধীরে প্রবাহিত হয়, এই ঘাটেই দিনের বেলা নদী পেরোনোর নৌকা পাওয়া যায়।

দীর্ঘ রাস্তা হেঁটে নদী পার হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। কারণ জিরো ব্রিজ লাল মাণ্ডি থেকে অনেক দূর। এত রাতে এবং শহরের এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে সেটা আরো বিপজ্জনক আমিরা কাদাল ব্রিজ দিয়ে আরেকটা রাস্তা আছে। কিন্তু সেটা আরো বেশি ভয়ঙ্কর আমিরা কাদাল যাওয়ার পথে অনেকগুলো বাঙ্কার পড়ে, সবথেকে বড় কথা ব্রিজটা নিজেই একটা বাঙ্কার। আমরা আয়েশাকে আশ্বস্ত করি যে পরদিন সকালে তারিককে খুঁজতে বেরোবো। তাকে বোঝাই যে গোলাগুলির পর তারিককে হয়তো কোনো উদ্বাস্তু শিবিরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সে ঘরে ফিরে যেতে খুব একটা সম্মত নয়। তার মুখে উদ্বেগের চিহ্ন কিন্তু কোনোরকমে আমরা তাকে খান সোজর্ণে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হই। সেই রাতে প্রতিবেশী দুই মহিলা এবং আমার স্ত্রী আয়েশাকে শান্ত করতে তার সঙ্গে থেকে যায় আমি বাড়ি ফিরিআমার দোকান থেকে আমার বাড়ি খুব কাছে। মাত্র ছ’টা বাড়ির পরেই।

পরদিন ভোরবেলা, প্রতিবেশীরা যখন সবে জেগে উঠছে, দুজন লোক মোটর বাইকে এসে থামে খান সোজর্ণের সামনে। আমি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। মহিলারা বারান্দার গ্রিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে সাগ্রহে তাকিয়ে। খুব নীচু স্বরে, যাতে মেয়েদের কানে না পৌঁছায়, লোক দুজন জিজ্ঞেস করে যে তারিক জারদার নামের কেউ এই বাড়ির বাসিন্দা কিনা। এরকম ভীতিকরভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ধরণ দেখে আমার হাঁটুর পিছনের মোটা শিরাগুলো অস্বিত্বহীন হয়ে যায় মনে হয় একটা পলকা উঁচু বাড়ির মতো আমি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছি। পেটের নাড়িভুড়িতে অকস্মাৎ একটা মোচড় অনুভব করি এবং আমার সাহস তলানিতে নেমে আসে। আমি কেবল  সম্মতিসূচক উত্তর দিতে পারি। লোক দুজন চায়ছিল আমি তাদের সঙ্গে যাই। ওদের সঙ্গে যাওয়া খুব দরকারি বুঝতে পেরে ওদের বাইকের শেষ প্রান্তে উঠে বসি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের জন্য সীমাহীন ধোঁয়াশা এবং অনিশ্চয়তা রেখে যাইআমার ভেতরটা বিপদের আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে

বড় রাস্তায় যখন হুশ করে বাইক ছুটছে, একটা তীব্র বাতাস আমার কথা উড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকে। একটা শীতল বাতাস আমার চোখ বিদ্ধ করে। ক্রমাগত শুষ্ক হতে থাকে আমার মুখ। শুকিয়ে যাওয়া দুটো অশ্রুধারা আমার কপালের শেষপ্রান্তে উঁচু হাড়ের দিকে ধেয়ে গেছে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে বাতাসের তীব্র গতি। তারিক আর নেই, লোক দুজন জানায় এবং চুপচাপ ওদের পিছনে বসে ঠোঁট কামড়ানোর এবং যন্ত্রণায় মুচড়ে ওঠার সুযোগ দেয় আমাকে

তাদের অনুমান, তারিক যখন অফিস থেকে বেরিয়ে বাঙ্কারের সামনে তখনই হামলা হয়। রাস্তায় তখন ভর্তি লোকজন। একমাত্র সে-ই পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করতে পারেনি। এখন আমার ভাবনার একমাত্র ব্যক্তি আয়েশা, তারিক নয়। তার মৃত্যু সংবাদের সঙ্গে সঙ্গে সে আমার মন থেকে মিলিয়ে গেছে। একটা চিন্তা ক্রমাগত আমাকে বিরক্ত করছে, বেচারি আয়েশার কী হবে এখন?

খানিক পরে আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম শ্রীনগর পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ছোট্ট, কাদায় মাখামাখি মর্গে।

তারিককে দেখে মনে হচ্ছিল সে ঘুমোচ্ছে। অত্যন্ত যত্ন করে ইস্তিরি করা ডোরাকাটা ধূসর রঙের স্যুট তার নিজেরই রক্তে ভেজা দু’পায়ে এবং ঘাড়ে গুলি লেগেছে। কিছু কাগজপত্রে সই করে সঙ্গে সঙ্গে লাশের দায়িত্ব নিই। নীল রঙের একটা বড় পুলিশ ট্রাকে শুয়ে আছে তারিকের লাশ। ট্রাকটা যতই বাড়ির কাছাকাছি আসে ততই আমার সাহস কমে গিয়ে ভয় হতে থাকেকিন্তু একটু দূরে একদল মানুষকে শ্লোগান দিতে দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচি। মৃত্যুর খবর পেয়ে গেছে ওরা। খান সোজর্ণ বিক্ষুব্ধ মানুষের ভিড়ে ভিড়াক্কার। ওপরওয়ালাকে ধন্যবাদ দিই; প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে আয়েশাকে এই ভয়াবহ খবর দেওয়া থেকে অব্যাহতি পাওয়া গেছে

আয়েশাকে আগলে রেখেছে মহিলাদের একটি বড়সড় দল ট্রাকটি গড়িয়ে যাচ্ছে, পিছনদিক বাড়িটির দিকে ঘুরিয়ে। ট্রাকের পিছনে যেখানে লাশটি দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে ভেসে আসছে নানান স্বরের বিলাপ। এর ফলে আমার স্ত্রীকে খুঁজে পেতে কিছুক্ষণ বেগ পেতে হয় মনে হচ্ছে আয়েশাকে সামলাতে বিদ্ধস্ত সে, আর আয়েশা একগাদা মেয়েদের আড়ালে হারিয়ে গেছে। আমি ওপরওয়ালাকে আবার ধন্যবাদ দিই যে আয়েশাকে আমি দেখতে পাইনি। কেননা তাকে আমি দেখতেও চাই না এবং মনে মনে ভাবি যে আমি তাকে মোটেও চিনি না। তাকে নানারকম করে কল্পনা করি। সে কাঁদছে, হাসছে অথবা নিজেই নিজেকে চাপড়াচ্ছে, বুক থাবড়াচ্ছে, চুল ছিঁড়ছে অথবা শোকে পাথর হয়ে গেছে। তারিকের মাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। তাঁকে এতক্ষণ ভুলেই গেছিলাম।

প্রতিবেশী মাতব্বর লোকজনদের সঙ্গে আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ষাট কিলোমিটার দূরে, তারিকের লাশ তার নিজের শহরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে লেগে পড়িপ্রতি মুহূর্তে শোক এবং প্রতিবাদ আরো চড়া হচ্ছে। দুপুরের দিকে যা আরও প্রবল আকার নেয় যখন তারিকের ভায়েরা, তাদের বউ এবং আয়েশার বোন এসে পৌঁছায়; এবং আমি আয়েশাকে দেখতে পাই। আশ্চর্যজনকভাবে, তাকে একেবারে স্বাভাবিক লাগে। নিজের দু’চোখকে বিশ্বাস করতে পারি না। প্রতিবেশী মেয়েরা, আমার স্ত্রী, আয়েশার বোন, তার ভাবিরা তাকে কাঁদানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু তার কোনো ভাবান্তর নেই। শেষমেশ, তারিকের মাকে দেখতে পাই। তার মাথা অনাবৃত, চোখে এক ফোঁটা জল নেই, কিন্তু কাঁদছে। তাঁর কান্না কেমন গজরানোর মতো মনে হচ্ছে। তাঁর কপালে তাজা ক্ষত, আড়াআড়ি লম্বাটে সরু ক্ষতটি জমাট বাঁধা রক্তে ঢেকে আছে। সম্ভবত তিনি শক্ত ও ধারালো কিছুতে মাথা ঠুকেছেন। হলুদ গুঁড়োর লেই তাঁর কপালে লাগিয়ে দিচ্ছে মেয়েরা।

সেই অপরাহ্ণের শেষদিকে, জোহর নামাজের ঠিক পরেই, শোকার্ত পরিজন, সহমর্মী প্রতিবেশীরা এবং তারিকের লাশ সহ কয়েকটি ট্রাক ও বাস, ইসলামাবাদের দিকে যাত্রা শুরু করে। আমরা সন্ধ্যের দিকে পৌঁছাই এবং সরাসরি ম্যাটানে তারিকের পারিবারিক কবরস্থানের দিকে যাই। পুরো গ্রাম তারিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য পাহাড় থেকে নেমে আসে কবরস্থানে। কবর দেওয়া এবং ফাতেহা সম্পন্ন হলে, পরিস্থিতি বোঝার জন্য আমরা তারিকের বাড়ি যাইসেই সন্ধ্যাটি অলসভাবে গড়িয়ে যায় রাতের দিকে। আমার স্ত্রী এবং জহর নগরের কিছু প্রতিবেশী আয়েশা ও তারিকের পরিবারের সঙ্গে থেকে যায়। আমি এবং কয়েকজন সহযাত্রী মধ্যরাতের দিকে ফিরে চলি রাস্তায় পার হতে হয় সামরিক বাহিনির ডজন খানেক সনাক্তকরণ প্রক্রিয়াতখন মুঠোফোন বা ল্যাণ্ড লাইন কিছুই ছিল না। থাকলেও, তা ছিল ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফলত আমার স্ত্রীকে জানাতে পারি না যে নিরাপদে ঘরে পৌঁছে গেছি।

পরদিন খুব সকালে, আবার রওনা দিই তারিকের শোকাহত পরিবারের উদ্দেশে। যাত্রাপথে তারিক ও আয়েশার অজস্র স্মৃতি মন ওলট পালোট করে দেয়, আমাকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

এবারে আমি আয়েশাকে খুব কাছ থেকে দেখি। তাকে সহানুভূতি জানাতে দ্বিধা করি না। যথারীতি তাকে স্বাভাবিক লাগে, কিন্তু একেবারে চুপচাপ। আমি শুধু আমার হাত তার মাথায় রাখতে পারি। কিন্তু সে আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। তারিকের মা এখনো শুকনো চোখে বিলাপ করে যাচ্ছেন। তাঁর কপালের ক্ষত একটা স্ফীত যন্ত্রণার মতো জমাট বেঁধে আছে। সম্মিলিত লোকের গুনগুণ শোকগাথার মতো ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে বাড়িটিতে একটা ঘর তারিকের বন্ধু ও ব্যাঙ্কের সহকর্মীতে ভর্তি। সেই অপরাহ্ণের শেষদিকে আমি ও আমার স্ত্রী শ্রীনগরে ফিরে আসি। একটাও কথা বলি না কেউ। কিন্তু আমাদের পুরো যাত্রাপথ গভীর দীর্ঘশ্বাসে ভরে ওঠে।

খান সোজর্ণের তালাবন্ধ ফ্ল্যাট, তার শূন্য বারান্দা এবং দোকানের আলু ও খোয়া লজেন্স আমাকে তাড়া করতে থাকে। তারিকের মৃত্যু জহর নগরকে আলোড়িত করে। অধিবাসিরা তারিক ও আয়েশার চমৎকার সম্পর্কের সত্যি কাহিনি জনে জনে বর্ণনা করতে থাকে তাদের অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করে তারিক ও আয়েশার সম্পর্ক এতই অস্বাভাবিকরকম মধুর ছিল যে অশুভ দৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পায়নি।

চতুর্থ আচার বিধি এবং সর্বশেষ শোক পালনের দিন, আমরা আবার শোকাহত পরিবারটির কাছে যাই। এবার আয়েশাকে অচেনা লাগে। কথা বলে না। যদিও, সে চুপচাপ বসে না থেকে ঘরের এখানে সেখানে ধীরে হেঁটে বেড়ায়, একদম তারিকের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, যেখানে সমবেদনা জানানোর জন্য লোকজন জড় হয়েছেপ্রথমে ভেবেছিলাম পায়ে বোধহয় ঝিঝি ধরেছে বা এরকম কিছু হবে পরে ভাবলাম পায়ে বোধহয় আঘাত পেয়েছে। কিন্তু আত্মীয় স্বজনরা জানালো তার পা স্বাভাবিক আছে। আমরা ফিরলাম। হতবুদ্ধি। শ্রীনগর ফেরার পথে আমার স্ত্রী আয়েশার পায়ের বিষয়ে কতরকম অনুমান যে করলো। কিন্তু তখনও আমরা আসল বিষয়টি ধরতেই পারিনি।

এক সপ্তাহ পর, আয়েশাকে খান সোজর্ণের ফ্ল্যাটে ফিরে আসতে দেখে আমি অবাকসঙ্গে তার বোন এবং কয়েকজন অপরিচিত মহিলাআমি তাকে দেখে খুশি হই। কিন্তু অবাকও হই একইরকমভাবে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে যেভাবে তাকে শোক পালনের অনুষ্ঠানে হাঁটতে দেখেছিলাম। তার বোনের কাছে জানতে পারি সে এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি এবং তাকে এখানে নিয়ে আসাটা পরীক্ষামূলক, যদি এই ফ্ল্যাট এবং ফ্ল্যাটের স্মৃতি তাকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনতে পারে। আয়েশার ফিরে আসার কথা জানতে পেরে একে একে জহর নগরের প্রতিবেশীরা খান সোজর্ণে ভীড় করতে থাকে। কিন্তু আয়েশা তাদের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন

পরের দিনটি ছিল আগের থেকে আরো বিস্ময়কর। আয়েশা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, রেলিঙের ওপর ঝুঁকে আছে ঠিক তারিকের মতো, একেবারে তারিকের ভঙ্গিতে সিগারেট টানছেতারিকের মতো দেহভঙ্গী এবং ধরণ নিয়ে সে দাঁড়িয়ে। আমাকে সে পুরুষের কন্ঠস্বরে অভিবাদন জানায়। কিছুদিন পর, দেখি তারিকের মতো করে তার চুল ছাঁটাসে বারান্দায় হেঁটে বেড়ায়, তারিকের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। মহিলারা চুপচাপ তাকে দেখে। আড়ালে গিয়ে কাঁদে। এক ঘন্টা পর, সে নীচে নেমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় যেভাবে তারিক দাঁড়াতো খোয়া লজেন্স কিনতে চায়। বয়াম থেকে লজেন্স বের করতে করতে লজ্জা লজ্জা করে বলে, ‘আয়েশা পাগলের মতো ভালোবাসে’।

আয়েশার সঙ্গের মেয়েরা তাকে ঘরে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে কারণ দিনে দিনে আয়েশা প্রতিবেশীদের কাছে দর্শনীয় হয়ে উঠছে। আরেক দিন, আয়েশাকে দেখি তারিকের ঘন নীল স্যুট পরেছে। অবিকল তারিকের মতো সিগারেট টানছে। পায়ে পরেছে তারিকের জুতো জোড়া। হাতে তারিকের চামড়ার ব্রিফকেস। লেংচে লেংচে সে সরু রাস্তায় নামছে অফিস যাবে বলে।

সম্ভবত এক পক্ষকাল পরের এক সকালবেলা, যখন আমি দোকান খুলছি, মাল বহনের একটা বড় গাড়ি খান সোজর্ণের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাইআমি ওপরে যাই এবং দেখি আয়েশার বোন ও অন্যান্য মহিলারা আয়েশা ও তারিকের জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করছে। দুজন মজুর জিনিসপত্র ট্রাকে তুলছে আয়েশা ভেতরেই আছেআয়েশার বোন জানায় যে আমি না গেলেও সে নিজে আমার দোকানে এসে ফ্ল্যাটভাড়ার দেনা পাওনা মিটিয়ে দিত। ভাড়া ও বিদ্যুতের পাওনা টাকা নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করি। কয়েক ঘন্টা বাদে, মাল ভর্তি ট্রাক শব্দ করে রওনা দেয়। একটা অ্যাম্বাসাডর ইতিমধ্যেই মেয়েদের নিয়ে যেতে এসেছে। আয়েশার ভাসুর বসে আছে চালকের পাশে। আমি টালমাটাল হেঁটে অসুস্থ আয়েশাকে বিদায় জানাতে যাই। তার পরনের অর্ধেক জামাকাপড় তারিকের। পিছনের আসনে মাঝখানে বসে আছে সে। আমি কিছু না বলে তার জন্য ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করি এবং তার মাথায় হাত রাখি। আয়েশার বোন মাঝে মাঝে তাদের দেখতে যাওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে। ফ্ল্যাট এখন শূণ্য। মজুরদের কথাবার্তা প্রতিধ্বনিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ফ্ল্যাটময়

আয়েশার মঙ্গল কামনায় একটা ছোটখাট জটলা তৈরি হয়ে যায়। আমার স্ত্রী এবং আশেপাশের মহিলারা নাক টানতে টানতে মৃদু ফোঁপানির শব্দ করতে থাকে

গত তেইশ বছরে আমি এবং আমার স্ত্রী অসংখ্য বার আয়েশাকে দেখতে গেছি ইসলামাবাদে। প্রত্যেকবার তাকে দেখেছি তারিকের মতো পোশাক পরেছে। লেংচে হাঁটছে অলিগলিতে। কৌতূহলী বাচ্চার দল তার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে মুখ টিপে হাসাহাসি করছে।

এই তেইশ বছর, আমার স্ত্রী আমার ‘বালা’ই লাগাই’-এর উত্তর দিয়ে আসছে কোনোভাবে ব্যর্থ না হয়ে।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

ব্যবহৃত ফটোগ্রাফ: লেখক  

--------------------------------------- 

মূল গল্প: The Woman Who Became Her Own Husband

গ্রন্থ:  Scattered Souls

প্রকাশক: হারপার কলিন্স

**লেখকের অনুমতি নিয়ে ভাষান্তরিত। দ্বিতীয় বার এখানে প্রকাশিত হল। 

--------------------------------------------------------------------------  

শাহনাজ বশির: ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের অন্যতম তরুণ লেখক। শ্রীনগরে অবস্থিত কাশ্মীর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণনামূলক সাংবাদিকতা (Narrative Journalism) ও দ্বন্দ্বমূলক প্রতিবেদন (conflict reporting)-এর শিক্ষক বশিরের লেখায় উঠে আসে কাশ্মীরের সাধারণ জনজীবনের হাহাকার, আশঙ্কার প্রহর আর অবদমনের দিনলিপি; যে জীবন সংবাদপত্রে অনুপস্থিত। তাঁর গল্পের এক একটি চরিত্র জীবন্ত হয়ে পাঠকের সামনে এসে দাঁড়ায়। দুমড়ে মুচড়ে দেয় পরিণত পাঠকের হৃদয়। তাঁর প্রতিটি গল্পে চারিয়ে যায় সাংবাদিক সুলভ প্রজ্ঞার সঙ্গে লেখকের অন্তর্দৃষ্টি ও সহমর্মিতা। স্ক্যাটার্ড সোলস গ্রন্থের প্রত্যেকটি গল্পের পটভূমিকা নব্বইয়ের দশক, যখন ভারতীয় সেনাবাহিনি ভূস্বর্গ অস্ত্রমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তার জেরে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে আর প্রতিটি দিন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। ভাষান্তরিত গল্পটিতে যেমন, আয়েশার দগ্ধ আত্মার সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যায় বিদ্ধস্ত কাশ্মীর। কাশ্মীর বহির্ভূত যে কোনো ভূখণ্ডের সচেতন পাঠক টের পাই অন্ধকারের কোনো এক প্রান্ত থেকে ভেসে আসা ক্ষয়াটে জীবনের হাহাকার। তীব্র, ক্ষুরধার এবং রক্তাক্ত। 

তাঁর গল্প বলার ধরণ ও লেখন শৈলী পাঠককে গল্পের ভেতর আকর্ষণ করে অচিরেই ঘনঘন কমা ও ‘এবং’ (and) অব্যয়ের ব্যবহারসহ দীর্ঘ যৌগিক বাক্য মৃদু স্রোতের মতো এগিয়ে চলে একটুও টোল না খেয়ে। সে বাক্য গঠন এমনই, বাংলায় হুবহু তা অনুসরণ করলে বাংলা হয়ে ওঠে না তা।   

তাঁর প্রথম উপন্যাস হাফ মাদার জিতে নেয় ‘মিউজ ইণ্ডিয়া ইয়ং রাইটার অ্যাওয়ার্ড’ (২০১৫)। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ স্ক্যাটার্ড সোলস ‘টাটা লিট লাইভ বেস্ট বুক ফিকশন’ (২০১৭)-এর তালিকায় স্থান পায় ও ‘দ্য সিটিজেন’স ট্যালেন্ট অফ দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ (২০১৬-১৭) জেতে। কাশ্মীর অবজারভার-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় কাশ্মীর উপত্যকায় সর্বাধিক বিক্রি হওয়া বই স্ক্যাটার্ড সোলস (২০১৮, এপ্রিল)

 সাংবাদিকতা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত বশিরের ইংরেজি পত্র পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, গল্প, কবিতা বিদ্দজনের আগ্রহ তৈরি করে চলেছে

-------------------------------------------------------------------------------