Total Pageviews

Wednesday, 4 October 2023

আমি ও আমার ‘রায় স্যর’, সৌমেন্দু রায় --- দ্বিতীয় পর্ব

 

আমি ও আমার ‘রায় স্যর’, সৌমেন্দু রায়

মৌসুমী বিলকিস

 


দ্বিতীয় পর্ব

চেনা শোনার বাইরে

সময়, কেমন করে যেন আঙুলের ফাঁক গলে বেরিয়েই যেতে থাকে; আর আমরা, বিমূঢ় হতচকিত আমরা স্থির হয়ে দেখি, মুঠো মুঠো স্মৃতির পাহাড় জমে ওঠে চারপাশে, হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে নিই বেঁচে থাকার রসদ, এইসব স্মৃতির ভেতর থেকে যায় কিছু আলোর ঝলক মাখানো মুহূর্তও, সেরকমই রায় স্যরের স্মৃতি।  

রায় স্যর, সত্তর পার করেও ঈর্ষনীয় রকমের ফিট রায় স্যর, আমাদের ভেতর চারিয়ে দেন আলোর ঝলক, আমরা গুটি গুটি পা ফেলে চলতে শুরু করি, চলতে চলতে ফিরে যাই তাঁর কাছে, বালীগঞ্জের ফ্ল্যাটে কখনও বা রূপকলা কেন্দ্রে গিয়ে ছুঁয়ে আসি তাঁর সান্নিধ্য; শুধু আমি নই, আমার সহপাঠীরাও।

বাতাসে ভর করে ভেসে আসে মিষ্টি এক সুবাস, আমরা বুঝতে পারি রায় স্যর পাইপ ধরিয়েছেন, তামাকের গন্ধ তাঁর মতোই পরিশীলিত, পাইপ মুখে স্যরকে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, তামাকের সুবাস মিশে যায় আমাদের প্রাত্যহিক ঘ্রাণে। 

আমার একটু সময় লেগে যায়, স্যরের ফিটনেসের রহস্য জানতে। আমাদের সহপাঠী গঙ্গাপ্রসাদ স্যরের ওপর তথ্যচিত্র বানাবে ঠিক করে, ওর তোলা ফুটেজে দেখি উপযুক্ত পোশাকে স্যর ভোরবেলা বেরিয়ে পড়েছেন শরীর চর্চায়, এটাই রোজকার বাঁধা রুটিন তাঁর। অবাক না হয়ে উপায় আছে?    

হঠাৎ করেই কোথাও দেখা হয়ে গেলে এগিয়ে আসেন নিজেই; কুশল বিনিময়, ব্যক্তি জীবনের খবর, কাজের খবর, সহপাঠীদের খবর নিতে ভোলেন না। আমরা আপ্লুত হয়ে আলোচনা করি তাঁর এই সহজ ও ঋজু ব্যক্তিত্ব।

একদিন তিনি কথার মাঝেই বলে ওঠেন, ‘তোমাদের ব্যাচটা একেবারে অন্যরকম ছিল।’, রূপকলা কেন্দ্রর প্রথম ব্যাচের কথা বলছেন বুঝতে পেরে বলি, ‘কিন্তু স্যর, আমাদের পরের শিক্ষার্থীরা কতকিছু জেনেই পড়তে এসেছে! টেকনিক্যালি অনেক স্ট্রং। সেই অর্থে আমরা কিছুই জানতাম না। এখান থেকে পড়াশোনা করে কত ভাল জায়গায় কাজ করছে, অনেক মায়নে পাচ্ছে। ভালই তো।’ স্যর পাইপে একটা টান দিয়ে বলেন, ‘সেসব ঠিকই আছে, কিন্তু তোমাদের মধ্যে একটা ইনোসেন্স ছিল।’ 

হয়তো তিনি অনেককেই একথা বলে থাকবেন। কিন্তু একথার মধ্যে কাউকে ব্যথা দেওয়ার কোনও ইচ্ছে স্যরের ছিল না, নিশ্চিত বলা যায়। এটা তাঁর উপলব্ধি, আমাদের গুটিকয় শিক্ষার্থীর বিষয়ে। এটুকু বলতে পারি, আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে শিক্ষক, অশিক্ষক এবং আরও যাঁরা রূপকলার প্রতিদিনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন প্রত্যেকেই আমাদের সবার নাড়ি নক্ষত্রর খবর রাখতেন, এমনকি আমরা নিজেদের বিষয়ে যা জানতাম তার থেকেও আমাদের বিষয়ে বেশিই বুঝতেন তাঁরা। স্যরের এই উপলব্ধি হয়তো তারই বহি:প্রকাশ। কিন্তু আমরা নিজেদের কখনও 'ইনোসেন্ট' ভাবিনি। 

      একদিন সত্যজিৎ রায়ের বিষয়ে এক আলোচনাসভা, বাংলা অ্যাকাডেমির সভাঘরে, মঞ্চে দেখি রায় স্যর, সভা শেষে স্যরকে ঘিরে এতজন যে আমি বাইরে বেরিয়ে আসি, কিছুক্ষণ পর উনি বাইরে এসে আমাকে দেখেই আমার কাছটিতে এসে দাঁড়ান, কুশল বিনিময়ের মাঝখানেই এক আলোকচিত্র শিকারি তাঁর ছবি তুলতে চায়, তিনি রাজি, কিন্তু, ‘এই যে, ও মৌসুমী, আমার ছাত্রী, ওর সঙ্গেই ছবি তুলুন’ বলেই আমার পাশে দাঁড়ান তিনি। অগত্যা ছবি শিকারি আমার সঙ্গেই তাঁর ছবি তোলেন।   

এইসব টুকরো মুহূর্ত আজ মনে পড়ছে বার বার। মনে পড়ছে আমাদের কোনও আব্দার উনি সহজে উপেক্ষা করতেন না। আমাদের ফিল্মস্কুলের সহপাঠী শুভঙ্কর অ্যানিমেশন শেখানোর স্কুল খুললো, উদ্বোধনের দিন রায় স্যরকে তার চাই, স্যর ঠিক পৌঁছে গেলেন, সেই বালিতে, আর আমাদের কয়েকজনকে একসঙ্গে দেখে কি খুশি যে হলেন।     

ফিল্মস্কুল শেষ করার পর স্যরের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করলে ঠিকই সময় দিতেন, রূপকলায় বা বালীগঞ্জের ফ্ল্যাটে ডেকে নিতেন আমাদের।

 

একদিন ফোন করলাম স্যরকে, কী মাছ খেতে ভালবাসেন জানতে চায়লাম, ‘সবই খাই, কিন্তু ছোট মাছ বাড়িতে হয় না’, বললেন তিনি, দু রকমের ছোট রান্না মাছ নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে গেলাম তাঁর ফ্ল্যাটে, ধবলদা মাছগুলো রান্নাঘরে গুছিয়ে রাখলেন, তখনও স্যরের দুপুরের খাওয়ার সময় হয়নি। ধবলদার বানানো চা খেয়ে নানান গল্পগুজব শেষে স্যরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম। 

ওমা! সেদিনই সন্ধ্যাবেলা স্যরের ফোন। মাছ কত সুস্বাদু হয়েছে সেটা নিয়েই বললেন মূলত। তারপর যেখানেই দেখা হয়েছে তাঁকে ঘিরে দাঁড়ানো লোকজনকে ‘শোন, মৌসুমী আমাকে মাছ রান্না করে খাওয়ায়…’, যেন খাওয়ানোটা ঘটমান বর্তমান! এতবার এরকম করেছেন, লজ্জাই পেত আমার। একদিন স্যরকে বললামও এমন করে না বলতে। উত্তরে, ‘না, দেখ কিছু জিনিস বার বার বলতেই ভাল লাগে…’, ইত্যাদি বলে আমার আপত্তিকে পাত্তাই দিলেন না। 

এই অভিজ্ঞতা আমার একার নয়, তাঁর অনেক শিক্ষার্থীই এরকম অনেক ঘটনা মনে করতে পারবেন। অনেকেই তাঁর জন্য রান্না বা কেনা খাবার নিয়ে যেতাম আমরা। ফোনে জেনে নিতাম কী খেতে ইচ্ছে করছে, তিনি বলতেনও। পারস্পরিক একটা অধিকার বোধও তৈরি হয়েছিল আমাদের অনেকের সঙ্গে তাঁর, সেজন্যই বোধহয় নির্দ্বিধায় এরকম করে বলতে পারতেন, আর আমাদের কাছেও খুব স্বাভাবিক ঠেকতো তা। 

একবার ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর ‘রোববার’-এর একটা সংখ্যার বিষয় ছিল ‘চিরকুমার’। এই সংখ্যায় রায় স্যরের লেখাও ছিল। আমার গোছা গোছা বইপত্রর ভেতর সংখ্যাটা কোথাও লুকিয়েছে, আপাতত খুঁজে পাচ্ছি না। স্পষ্ট মনে আছে লেখাটায় তিনি শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে রোম্যান্সের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। 

লেখাটা বেরনোর পর স্যরের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। যেমন অনেকের লেখা পড়ে বলি, স্যরকেও বললাম, লেখাটা পড়েছি। উনি এমন লজ্জা পেয়ে হাসতে লাগলেন যে আমি অপ্রস্তুত। দেখলাম, তাঁর মুখ জুড়ে বিগত দিনের আলোছায়া খেলে বেড়াচ্ছে, এক লহমার জন্য। এই স্যর আমার কাছে অভিনব। লেখাটা নিয়ে তাঁকে আর একটা কথাও বলিনি, তখনও না, আর কখনও না।

আমার পরিবারের এক সদস্যর হার্ট অ্যাটাকের খবর কোথাও থেকে তিনি শুনেছেন। একদিন ফোনে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। খুবই বিমর্শ হয়ে বললেন, ‘আমার কাছে এরা বাচ্চা। তাদের এরকম খবর শুনতে একদম ভাল লাগে না।’ এর দু'তিন বছর বাদে সেই আপনজনের মৃত্যুর খবর স্যরকে দিতে পারিনি।  

তাঁর একটা বই প্রকাশ হয়েছে, ‘চলচ্চিত্র চলচ্চিত্র’। বইটা তখনও আমার সংগ্রহ করা হয়নি। একটা কাজে এমন জড়িয়ে আছি যে নিজের জন্য এতটুকু সময় নেই। তার মধ্যেই একদিনের অবসর পেয়ে একদিন স্যরের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। দেখি তিনি বসার ঘরের কেদারায় শুয়ে আছেন, পা দুটো গদি মোড়া একটা লম্বাটে টুলের ওপর। চেহারা আগের থেকে একটু ভেঙে গেছে। দাঁতের সমস্যার জন্য সব কথা ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না।  আমাকে দেখে চোখ দুটো তাঁর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যেমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেই হয়, অনেক কথা বলতে চান, কখনও বা একেবারে চুপ করে যান।



‘চলচ্চিত্র চলচ্চিত্র’ বইটার কথা উল্লেখ করতেই আমাকে এক কপি দিলেন, ধবলদা এনে দিলেন পাশের ঘর থেকে। আমি আব্দার করলাম, ‘স্যর, কিছু লিখে দেবেন না?’ বললেন, ‘পরে লিখে দেব, তুমি বইটা আবার নিয়ে এসো।’ তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। মত পাল্টালেন। বইটা চেয়ে নিয়ে অনেকটা সময় ধরে লেখা শেষ করতে পারলেন, ‘S Ray’। তাঁর হাত কাঁপছে, আর কিছু লিখতে পারলেন না।   

সব মিলিয়ে শিশুর মতো অসহায় লাগছে তাঁকে। একথা মনে হতেই কিছুক্ষণ জড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে, নির্দ্বিধায় বললাম। ‘দাঁড়াও’ বলে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলেন। মেঝের ওপর এক হাঁটু মুড়ে কেদারার পাশে বসে কিছুক্ষণ তাঁকে জড়িয়ে থাকলাম। তিনি ধীরে ধীরে তাঁর গাল আমার মাথার ওপর স্থাপন করলেন। তিনি আমার রায় স্যর, নাকি এক শিশু- গুলিয়ে যাচ্ছে আমার।      

আরও একটা আব্দার করলাম, এভাবেই একটা ছবি তোলার, স্যর তাতেও রাজি। ধবলদা আমাদের সেই ছবি তুলে দিলেন। তাঁর মাথার দিকের জানলাটা তখন বাইরের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। আমার সস্তার মোবাইল ক্যামেরা সেই আলোর স্রোতের সামনের মানুষ দুজনকে যে খুব ভাল ধরে রাখতে পারলো তা নয়। 

স্যরকে এবার শুয়ে পড়তে বললাম, অনেকক্ষণ বসে আছেন। বাধ্য শিশুর মতো শুয়ে পড়লেন। বিদায়ের সময় বললেন, ‘তোমরা এলে ভাল লাগে।’ 


স্যরের শরীর আর কোনদিনই ঠিক হয়নি। অনেকের মতোই স্যরের এই অচল হয়ে যাওয়া আমিও মেনে নিতে পারিনি। করোনা, পেশা বিপর্যয়, দুই লক ডাউনের মাঝখানে পারিবারিক সদস্যদের মৃত্যু; সব মিলিয়ে গভীর অবসাদ আমাকে স্যরের কাছে যেতে দেয়নি। গেলে কিছুই লুকোতে পারতাম না। আর ওইরকম মানসিক অবস্থায় স্যরের আরও শারীরিক অবনতি নিতে পারতাম বলেও মনে হয় না। 

হয়তো ভালই হল, দীর্ঘ দিনের যন্ত্রণামুক্তি হল। কিন্তু বেদনা বেদনার মতোই বুকে বাজে।

(শেষ)  

----------------------------------------------------------------------------------------------- 

ছবি সৌজন্য: ইন্টারনেট এবং নিজের অ্যালবাম  

      

Monday, 2 October 2023

আমি ও আমার ‘রায় স্যর’, সৌমেন্দু রায় -- প্রথম পর্ব

 

আমি ও আমার ‘রায় স্যর’, সৌমেন্দু রায়

মৌসুমী বিলকিস

 

প্রথম পর্ব

সিনেমা ইশ্‌কুল

রায় স্যরের সঙ্গে কত যে স্মৃতি! সেগুলো এতই প্রাত্যহিকতার সঙ্গে জড়িয়ে যে আলাদা করে মনে রাখতে হবে ভাবিনি কখনও। তাঁর শান্ত, সৌম্য, বিনয়ী, সদা হাস্যময় উপস্থিতি জ্যোতিষ্কর মতো উজ্জ্বল যদিও। তিনি আসলে জ্যোতিষ্কই, আমাদের মলিন জীবনে কিছু আলোর ঢেউ তুলে দিয়েছেন। 

মলিন জীবন তো বটেই। আমাদের ফিল্ম স্কুল ‘রূপকলা কেন্দ্র’-এ সুযোগ পাওয়া ছেলেমেয়েরা সবাই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের, প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্ট মিলিয়ে গুটিকয় শিক্ষার্থী, তাতে মেয়েদের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য, মোট চারজন, তার মধ্যে একজন কয়েক মাস পরেই স্কুলছুট। রইলো বাকি তিন; পরিচালনায় আমি, অ্যানিমেশনে মৌ আর ডেভলপমেন্ট কমুনিকেশনে দেবস্মিতা।    

‘রূপকলা কেন্দ্র’-কে ঘিরে আমার সিনেমা পাঠের টেকনিক্যাল পর্ব শুরু হল। আর সেই পাঠদানের অন্যতম এবং প্রধান কারিগর ছিলেন সৌমেন্দু রায়। ফলে প্রায় প্রতিদিনই তাঁর সঙ্গে দেখা হত। তাঁর দরজা শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল সবসময় খোলা। ফিল্ম স্কুল শেষ করার পরে তাঁর বালীগঞ্জের বাড়িতেও শুরু হল আমার, আমাদের অবাধ যাতায়াত।

তিনি শুধু আমার শিক্ষকই ছিলেন না, যে কোনও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করা যেত। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে আসার আগে তাঁর কত পরামর্শই যে নিয়েছি! তখন ছিল সেলুলয়েডের যুগ। শুটিং শুরুর আগে থেকে সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে প্রচুর ক্যান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। প্রত্যেকটি ক্যান এত এক্সপেনসিভ ছিল যে ক্যান নষ্ট করার ঝুঁকি কোনও পরিচালক নিতে চায়তেন না। তবে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দুয়েকজন পরিচালককে দেখেছি প্রচুর অপ্রয়োজনীয় শট নিয়ে ক্যান নষ্ট করতে। পরে যখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ শুরু হল পরিকল্পনাহীন শট নেওয়ার ধুম বেড়ে গেল, পোস্ট প্রোডাকশনে অনেককিছুই ঠিক করে নেওয়ার টেকনোলজিও এসে গেল।

এই প্রসঙ্গে রায় স্যর একদিন, ‘সবই এখন পোস্ট প্রোডাকশনে করে নেওয়া যাবে’, বলে হো হো করে হেসে উঠলেন। কখনও বা খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বিষয়টা নিয়ে দুশ্চিন্তাও প্রকাশ করতেন। বলতেন, ‘যতই পোস্ট প্রোডাকশনে সবকিছু ঠিক করে নেওয়া যাক না কেন, বেসিক কাজ ঠিকঠাক হওয়া উচিত। ফ্রেমিং, কম্পোজিশন, বেসিক লাইট-এইসব তো আর ঠিক করতে পারবে না। আর যদি কখনও এসব করাও যায় তা খুব এক্সপেনসিভ হবে। তার থেকে শুটিং-এর সময় ঠিকঠাক শুট করাটাই ভাল নয় কি?’  


একবার গান ও মিউজিক শুটিং এক্সারসাইজের জন্য ফিল্মস্কুল থেকে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল তালসারি। সঙ্গে আমাদের শিক্ষকরা এবং রায় স্যারও। যাওয়ার পথেই সকাল সকাল নিউজ পেপার কিনতেই দেখা গেল সাদ্দাম হুসেন একটা ছোট্ট গুহা থেকে ধরা পড়ে গেছেন। তখন শীতকাল। কিন্তু এত বৃষ্টি শুরু হল যে শুটিং করা গেল না দু দিন। আমরা শীতের পোশাক মুড়ি দিয়ে খাচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি, শুটিং স্ক্রিপ্ট নিয়ে কথা বলছি আর এদিক সেদিক ঘুরছি। সন্ধ্যায় সবাই এক জায়গায় বসে নানান আড্ডা আর আলোচনা চলছে। আলোচনার মাঝেই চিন্তিত রায় স্যর বলে উঠলেন, ‘সবই হচ্ছে, কিন্তু শুটিংটা-ই… খরচ বেড়ে যাচ্ছে তো!’ 

রায় স্যরের দুশ্চিন্তায় আমাদেরও চিন্তা হল। শিখলাম, ভাল করে শুটিং করা যেমন জরুরি খরচের দিকটাও মাথায় রাখা দরকার। শেষমেশ তৃতীয় দিন থেকে আমরা শুট করতে পারলাম এবং সব কাজ শেষ করে ফিরেও এলাম কলকাতায়। স্যরও স্বস্তি পেলেন।

মাঝে মাঝেই রায় স্যর আমাদের সিনেমা দেখাতেন, নিজেও আমাদের সঙ্গে ক্লাসরুমে বসে সিনেমা দেখতেন। এর বেশিরভাগই ছিল সত্যজিৎ রায়ের ফিল্মগুলো। সিনেমা দেখার পর আমাদের নানান কৌতূহল নিরসন করতেন। নিজেও প্রশ্ন করতেন মাঝে মাঝে।

একদিন ‘চারুলতা’ দেখার পর জানতে চাইলাম, চারুলতা যেখানে দোলনায় দুলছে, গায়ছে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে…’ ওই বিশেষ শটটা কী ভাবে নেওয়া হয়েছিল। তখন টেকনিক্যালি আর একটু বুঝতে শিখেছি। ওই শটটায় ফোকাস চারুলতার মুখে, একবারও ফোকাস আউট হচ্ছে না এবং চারুর মুখের সঙ্গে সমান দূরত্বে ক্যামেরাও দুলছে। দোলনার শটে এটা কী ভাবেই বা সম্ভব? বিহাইন্ড দ্য সিন নিয়ে খুবই কৌতূহল জেগেছিল।

স্যর বললেন, দোলনার সামনের দিকে ক্যামেরার জন্য একটা পাটাতন বানানো হয়েছিল। সেখানে ক্যামেরা বেঁধে ফিক্স করে, ক্যামেরা রোল করে দোলনাটা দুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে চারুর সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরাও সমান ছন্দে দুলেছে এবং ফোকাসও ফিক্স রাখা সম্ভব হয়েছে।

শুনে আমরা বেশ মজা পেয়েছিলাম। কারণ সেসময় যেখানে সেখানে ক্যামেরা মাউন্ট করার এখনকার মতো এত উপকরণ ছিল না এবং ক্যামেরাও ছিল এখনকার তুলনায় ভারি। 

আরেক দিন আমরা দেখলাম ‘গুপি গায়েন বাঘা বায়েন’। সেখানে বেশ কিছু দৃশ্য আছে যাতে হঠাৎ করে জিনিসপত্র বা মানুষজন ফ্রেমে চলে আসে বা গায়েব হয়ে যায়। যেমন গুপি-বাঘার হাততালির পর বা খাবারের থালার দৃশ্যে। এখন এসব জলভাত হয়ে গেছে। অনেক ভ্লগে দেখা যায় এই ধরণের শটের আকছার, অপরিকল্পিত ব্যবহার। কিন্তু সত্যজিৎ রায় এই ফিল্মটিতে বিশেষভাবেই এই ধরণের টেকনিক ব্যবহার করেছেন। 

এগুলো কী ভাবে শুট করা হয় তার খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিলেন স্যর। এখন সবাই জানেন এই শট কী ভাবে নেওয়া হয়। কিন্তু সেলুলয়েডের যুগে এই শট নেওয়া খুব সহজও ছিল না।


                                       সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে রায় স্যর 

আর একদিন স্যারের সঙ্গে আমরা দেখলাম ‘সীমাবদ্ধ’। ফিল্ম শেষ হলে স্যার আমাদের প্রশ্ন করলেন, ‘শেষ দৃশ্যে ক্যামেরাটা টপ অ্যাঙ্গেলে চলে গেল কেন?’ আমরা সবাই চুপ।

ফিল্মস্কুলে আসার আগে গল্প-উপন্যাস পড়ে সেই বিষয়ে আমার নিজস্ব মতামত তৈরি হতে শুরু করেছে, প্রফেশনালি বই নিয়ে আলোচনাও লিখছি। এছাড়াও আমার গল্প-কবিতা-আর্টিক্যাল এখানে সেখানে বেরোচ্ছে। কিন্তু তখনও সিনেমা নিয়ে লেখা শুরু করিনি। তবু গল্পটা বিষয়ে চট করে ভেবে নিয়ে সাহস করে বললাম, ‘স্যর, চেষ্টা করবো?’ তিনি অনুমতি দিলেন।

বললাম, ‘গল্পের নায়ক শ্যামলেন্দু কর্পোরেট অফিসের ইঁদুর দৌড়ে প্রমোশন পেতে অনৈতিকতা করেছেন। এমনকি একজন কারখানা কর্মীর জীবন-মরণ অবস্থা হয়েছে। এতক্ষণ ধরে শ্যামলেন্দু ভাবছিলেন তাঁর অপকর্ম কেউ ধরতেই পারেনি। কিন্তু তাঁর শ্যালিকা তুতুল ধরে ফেলেছে, এটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে তাঁর, এই প্রথম। এটা বোঝাতেই সম্ভবত টপ অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করা হয়েছে। ক্যামেরা একেবারে সিলিং ফ্যানের ওপর থেকে দেখছে তাঁকে। ঘরের সমস্ত জিনিসপত্রর মধ্যে হারিয়ে গেছে তাঁর অবয়ব। তুতুল চলে গেছে। একা বসে আছেন শ্যামলেন্দু।’   

খুব প্রশংসা করলেন স্যর। প্রশংসা পাওয়ার মতো কিছু হলে দরাজ গলায় বলতেন। আমরাও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম আর সেদিন প্রথম বুঝলাম ক্যামেরার অবস্থানও কেমন করে গল্পের নিহিত অর্থ ইঙ্গিত করে।

আমাদের মতো নবীনদের নতুন কাজ বা ভাবনা হয়তো তাঁর কাছে এমন কিছুই ছিল না, কিন্তু আমাদের ছোট ছোট এবং কাঁচা (এখন বুঝি) কাজ দেখেও তিনি প্রশংসা আর উৎসাহে ভরিয়ে দিতেন। সেসব যে আমাদের কি প্রেরণা দিত তা লিখে বোঝানো যাবে না। 

একবার আমেরিকান চলচ্চিত্রকার জন জোস্ট এলেন আমাদের ক্লাস নিতে। আসলে ‘ক্লাস নেওয়া’ বলতে বেশিরভাগ সময় হাতেকলমে শেখালেন। আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম তাঁর একটা বাক্স দেখে, যার মধ্যে মিনি প্রজেক্টার এবং স্ক্রিন। যেখানে ইচ্ছে চলে গিয়ে তিনি স্ক্রিনিং করতেন। তখনও এত হ্যান্ডি জিনিসপত্র আমাদের এখানে দেখিনি।

তিনি মিনি ডিবি ক্যামেরাকে একেবারে খেলনার মতো ব্যবহার করছেন দেখলাম। তখনও আমরা এতটা অ্যাবস্ট্রাক্ট চলচ্চিত্রে অভ্যস্ত হইনি। কিন্তু দারুণ মজা পাচ্ছি এভাবে ছবি তুলতে। তাঁর তত্ত্বাবধানে সহপাঠীদের মতো আমিও বানালাম আমার ছোট্ট ভিডিও। জন জোস্ট আমাদের ক্লাস নিয়ে চলে যাওয়ার পর একদিন রায় স্যর দেখলেন আমাদের তোলা ভিডিও, কিন্তু বিশেষ কিছু বললেন না, অন্তত আমার ভিডিওটা দেখে। 

তখনও আমাদের প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টের ক্লাস একসঙ্গে হচ্ছে। পঞ্চাশ দিনের পর আমরা যে যার বিভাগে আলাদা হয়ে যাব। কিছুদিন পর আমাদের আরেকটা এক্সারসাইজ শুরু হল। এই এক্সারসাইজের মজা হল আমরা যে যা নিয়ে পড়তে এসেছি সেই ভূমিকা ছাড়াও আমাদের পালন করতে হবে অন্যান্য ভূমিকাও। তো আমি একটা ফিল্মে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করলাম। তাতে ছিল একটা ট্র্যাক ইন শট, ট্র্যাক করে ক্যামেরা এগিয়ে যাবে দুজন চরিত্রর দিকে এবং শেষমেশ মুখের ক্লোজ ধরবে। আর শুধু ট্র্যাক করলেই হবে না, ট্র্যাকের সময় কম্পোজিশন ঠিকঠাক রাখা এবং শেষতম ক্লোজটা একটু জুম করে অ্যাডজাস্ট করা। ট্র্যাক, জুম, পানিং সব একসঙ্গেই করতে হল। এখন বুঝতে পারি শটটা টেকনিক্যালি কঠিন ছিল।

তবুও পুরো টিম বেশ উৎসাহ নিয়ে কয়েক বার রিহার্সাল দিয়ে শটটা টেক করে ফেললাম। পরে সম্পাদনা ইত্যাদি করে যখন ফিল্মটা রেডি হল তখন একদিন সবার কাজ একসঙ্গে দেখলেন আমাদের শিক্ষকরা। আমার কাজ দেখে জন জোস্টের তত্ত্বাবধানে কাজ করার ভিডিওটার তুলনা করে রায় স্যর বললেন, ‘এই তো কি সুন্দর কাজ করেছো! আগেরটায় হাত কেঁপে যাচ্ছিল, ক্যামেরা শেক করছিল!’ বলেই উনি হো হো করে হাসতে লাগলেন। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝি, জন জোস্টের কাজের ঘরানার সঙ্গে তাঁর কাজের ঘরানা একেবারেই ভিন্ন। জন জোস্ট ক্যামেরা ওভাবেই ব্যবহার করতে শিখিয়েছিলেন আমাদের। তিনি নিজে যখন শট টেক করছিলেন ক্যামেরাটা যেদিকে খুশি ঘুরিয়ে দিচ্ছিলেন, ক্যামেরায় ঝাঁকুনি দিচ্ছিলেন ইত্যাদি। যার ফলে ভিডিওগুলো হয়ে যাচ্ছিল ফোকাসহীন, চলমান রঙের আঁচড়ের মতো।



পঠন পাঠনের একদম প্রথম দিকে আমাদের একটা এক্সারসাইজ ছিল সাদাকালো স্টিল ফটো জুড়ে ‘পাওয়ার পয়েন্ট’ সফটওয়ারে গল্প বলার। এখনকার মতো এত অ্যাডভানসড সফটওয়ার তখন ছিল না। আর খুব ভারি ভারি ডেস্কটপে কাজ করতাম আমরা।

দুজন করে টিম। আমি আর প্রশান্ত কর্মকার এক টিমে। ও ক্যামেরা বিভাগে পড়তে এসেছে। দুটো করে অ্যানালগ ক্যামেরা, নরম্যাল লেন্স দেওয়া হয়েছিল প্রত্যেকটা টিমকে আর ফিল্ম রোল। প্রত্যেকে আমরা পরম উৎসাহে ‘বিষয়’ খুঁজতে লেগে পড়লাম।  

আমি তখন কাঁকুড়্গাছিতে একটা হোস্টেলে থাকি। যাতায়াতের পথে রোজই দেখতে পাই ট্রাম লাইনটা যেদিকে বেঁকে গেছে তার ধারে ওভার ব্রিজের নীচে ফুটপাথের ওপর একটা পরিবার বাস করে। তাদের কত দৈনন্দিনতার সাক্ষী থেকে যাই আমি। বিষয় হিসেবে মনে মনে এই পরিবারটাকেই ঠিক করলাম। প্রশান্তকে বলতেই মেনে নিল। শিক্ষকরাও রাজি।

আমি একা একা কয়েক বার গিয়ে পরিবারটার সঙ্গে ভাব জমিয়ে এলাম। ওদের বললাম ছবি তুলবো। শুনে রাজি হয়ে গেল। প্রশান্ত সাংঘাতিক এনারজেটিক। কোথা থেকে একটা ছোট টেপ রেকর্ডার যোগাড় করে ফেললো। তখনও স্মার্ট ফোন দূর অস্ত, আর যে কোনও ডিভাইস যোগাড় করা আমাদের পক্ষে বেশ কঠিন। আমরা প্ল্যান করলাম ওই টেপ রেকর্ডারে পরিবারটির সদস্যদের ইন্টারভিউ বা যেমন খুশি কথা রেকর্ড করবো এবং সেগুলোর সঙ্গে মানানসই স্টিল জুড়ে জুড়ে তথ্যচিত্র দাঁড় করাবো। ছবি তোলা এবং ইন্টারভিউ নেওয়া সমানতালে চলতে লাগলো।

মেয়েদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কিছু ছবি আমি তুললাম, অবশ্যই অনুমতি নিয়ে। তার মধ্যে শিশুকে স্তন্যপান করানোর ছবিও ছিল। ছবিগুলো দেখেই আমাদের ফিল্ম স্কুলের তৎকালীন ডিরেক্টর অনিতা অগ্নিহোত্রী আমাকে ডেকে পাঠালেন। স্তন্যপানের ছবি অনুমতি নিয়ে তুলেছি কিনা জানতে চাইলেন। অনুমতি নিয়ে তোলা শুনে আশ্বস্ত হলেন এবং ছবিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিলেন।

নিজের কাজের ব্যস্থতার মধ্যেও আমাদের প্রত্যেকটি কাজের এবং ‘অকাজের’ খবর তিনি রাখতেন। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিতেন। বেশিরভাগ সময় ক্লাস রুমে নিজে উপস্থিত থাকতেন। এগুলো না করলেও তাঁর পদ অনুযায়ী কিছু যায় আসতো না। কিন্তু আমাদের ছোটবড় সব বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে তিনি জড়িয়ে রেখেছিলেন, আর আমরাও সবকিছু নিয়েই তাঁর সঙ্গে যে কোনও সময় আলোচনা করতে পারতাম। তবে চুপি চুপি বলে রাখি, তাঁর বিষয়ে সমীহ মেশানো এক ধরণের দূরত্ব আমাদের ছিল (এখনও আছে)। এটা বোধহয় দরকারিও ছিল। প্রসঙ্গত বলি, তিনি না থাকলে আমার ফিল্মস্কুলে পড়া বাতিলই হয়ে যাচ্ছিল, অর্থাভাবে।  

আমাদের স্টিল ফটোগ্রাফি প্রোজেক্টের কাজ প্রায় শেষের দিকে। ওই পরিবারের এক পুরুষ সদস্য আমাদের শুটিং বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। প্রশান্ত তাকে কিছুটা সামলালো। ওই পরিবারের বাচ্চা ও মহিলা সদস্যরা আমাদের সাহায্য করাতে ছবি তোলা এবং ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ করতে পারলাম। এই প্রজেক্টের শুরুর ভয়েস ওভার এখনও মনে আছে, ‘হামলোগ জব্বলপুর সে আয়া হুঁ…।’  

স্পষ্ট মনে পড়ে, স্ক্রিনিং-এর দিন একটা ঘরে আমরা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা এক জায়গায় হয়েছি, আছেন রায় স্যরও। পাওয়ার পয়েন্ট-এ তৈরি করা তথ্যচিত্রটা দেখার পর হাসতে হাসতে বললেন, ‘তোমাদের ছবিগুলো খুব সুন্দর হয়েছে। প্রশান্ত আছে বলেই হয়তো।

প্রশান্ত ফিল্ম স্কুলে আসার অনেক আগে থেকেই স্টিল ছবি তোলাটা গুলে খেয়েছে। তার কাছে বক্স ক্যামেরা থেকে শুরু করে কত ক্যামেরা এবং বাড়িতেই নেগেটিভ থেকে ছবি পরিস্ফুটনের জন্য ল্যাব সে বানিয়ে নিয়েছিল। সেটা রায় স্যরও জানতেন। আর বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার রাধু কর্মকার তার কাকা বা জ্যাঠা হতেন বলে শুনেছি। কিন্তু প্রশান্ত নিজে এসব নিয়ে কিছুই বলেনি কখনও, অন্তত আমার সামনে।    

আমার এরকম কোনও ব্যাক গ্রাউন্ড ছিল না। আমার পরিবারের আমি ও ভাইবোনেরাই ফার্স্ট জেনারেশন যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য এসেছি। সেসব অনেক কথা। আজ থাক।  

ছবি, পেন্টিং আর সিনেমা দেখে দেখে কম্পোজিশন, আলোছায়া, রং ইত্যাদি বিষয়ে ভালমন্দের ধারণা তৈরি হয়েছে আমার। আর তখনও তা খুব পোক্ত নয়, এখনকার ধারণা দিয়ে বিচার করতে পারি। তবু ওই প্রোজেক্টে যত ছবি ব্যবহার করেছিলাম আমরা তাতে প্রশান্ত এবং আমার তোলা প্রায় সমান সংখ্যক ছবি ছিল।

ছবি নির্বাচনের ভার সম্পূর্ণ প্রশান্তর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম, ছবির বিষয়ে ওর এক্সপারটিজের কারণেই। বেস্ট ছবিগুলোই বেছে নিয়েছিল প্রশান্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই প্রজেক্টটা হারিয়ে গেছে। রূপকলা কেন্দ্রের আর্কাইভেও খুঁজে পাইনি। সব মিলিয়ে রায় স্যর আমাদের প্রজেক্টটার খুবই প্রশংসা করেছিলেন, অনেকেই হয়তো মনে করতে পারবেন, স্ক্রিনিং-এর বাইরেও বলেছিলেন অনেক বার। শিক্ষার্থী থাকাকালীনই রায় স্যরের স্বীকৃতি আমাদের কাছে ছিল বিরাট পাওনা।

আমাদের ডকুমেন্টারি এক্সারসাইজ হিসেবে অনেক উত্থান পতনের ভেতর দিয়ে ‘কবি’ তথ্যচিত্র পরিচালনা করলাম। ক্যামেরায় ছিল আমার সহপাঠী সঞ্জীব দাস, সম্পাদনায় প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। আমার জেলা মুর্শিদাবাদের মহিলা কবিয়াল দুলালী চিত্রকর ছিলেন এই তথ্যচিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র। দুলালীদি এতই চিত্তাকর্ষক ভঙ্গীতে কথা বলেন, গান করেন যে আমার তথ্যচিত্রের হাজারটা দোষ তাঁর গুণেই চাপা পড়ে গেল। তখন আমাদের ফিল্মস্কুলে সাউন্ড ডিপার্টমেন্ট শুরু হয়নি। ফলে শব্দেই বেশি খামতি থেকে গেল, ঢোলের আওয়াজ গেল ফেটে। 

তবু এই তথ্যচিত্র বানানোর সময় আমাদের শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মীরাও খুবই ইনভলভ হয়ে পড়লেন। কবিগানের কলি আমাদের সবার মুখে মুখে ফিরতে লাগলো। এত খামতির পরেও রায় স্যর অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেন। টিমের সবাই দারুণ খুশি।



এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমাদের প্রত্যেকটা প্রজেক্ট অনেক সীমাবদ্ধতা নিয়েই তৈরি করতে হত। তথ্যচিত্রটাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবু আমার স্ক্রিপ্ট এবং বিষয়ের জন্যই হয়তো কলকাতার বাইরে গিয়ে শুটিং করার অনুমতি পেয়েছিলাম অনিতা অগ্নিহোত্রী ম্যামের থেকে, যা আমার কোনও সহপাঠী পায়নি। তাতে একটু অসন্তোষও তৈরি হয়েছিল আমার কোনও কোনও সহপাঠীর ভেতর। এই অনুমতি না পেলে তথ্যচিত্রটা তৈরিই হত না। কারণ দুলালীদি মূলত গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরেই গান করেন। আমরাও ক্যামেরা নিয়ে চললাম তাঁর সঙ্গে সঙ্গে।   

তখন এত ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হত না। হলেও সব ফেস্টিভ্যালের খবর আমাদের কাছে থাকতো না। তথ্য বিস্ফোরণের যুগ শুরু হয়নি তখনও। আমরাও অত ‘স্মার্ট’ ছিলাম না যে খুঁজে পেতে কোনও ফেস্টে পাঠাবো আমাদের ফিল্ম। কিন্তু তার পরেও দু একটা ফেস্টিভ্যালে ‘কবি’ সুযোগ পেয়ে গেল। কলকাতা ফিল্ম ফেস্ট তো বটেই, তার সঙ্গে দিল্লির ‘জীবিকা’ ফিল্ম ফেস্ট এবং ইতালির একটা ফিল্ম কনফারেন্সেও (‘চিনেমা সিভিলে পায়েস্তুম’)। 

ইতালিতে সুযোগ পাওয়ার খবর রায় স্যরকে জানাতেই এত খুশি হলেন, বললেন, ‘ভাল খবর বিশেষ পাই না, চারদিকে শুধু খারাপ খবরই শুনি। খুব ভাল লাগছে। যাও, ঘুরে এসো। কিছু দরকার হলে বোলো কিন্তু।’ ইত্যাদি আরও ভাল ভাল কথা। তখন আবেগাহত হয়ে পড়েছি, বেশ মনে আছে।  

ফাইনাল প্রোজেক্ট হিসেবে ডিপ্লোমা ফিল্ম বানানোর সময় এসে গেল। মানে এই ফিল্ম শেষ হলেই আমাদের ফিল্মস্কুলের মেয়াদ শেষ। ছোট কাহিনিচিত্র বানালাম, ‘শবনম’। ক্যামেরায় সুদীপ পাঠক, তার সহকারি শুভদীপ দে। রিয়েল লোকেশনে শুট করেছিলাম আর সেট প্রপস আমি নিজে হাতে সাজিয়েছিলাম, একটা ছোট্ট কল্পনা-দৃশ্য শুধু স্টুডিওর ভেতর শুট করেছিলাম। বলাই বাহুল্য, এই ফিল্মেও নানান ভুল থেকে গেছে। তবু আলোকসম্পাত এবং সেট রায় স্যরের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল আর তাতেই আমাদের টিম দারুণ খুশি।

কিন্তু হল কি, শুটিং চলাকালীন ঠাণ্ডা লেগে আমার কেন্দ্রীয় চরিত্রর চোখের ওপরে অল্প ফুলে গেল। আমার দরকার ছিল ‘নো মেকআপ’ লুক। আগের সঙ্গে কন্টিনিউটি মিলছে না। মেকআপ আর্টিস্টকে বললাম সমাধান কিছু করা যায় কিনা। উনি এমন কিছু করলেন যে চোখ দুটোর ওপর একটু লালচে রং এসে গেল। কন্টিনিউটি কিছুই মিললো না। তবু ওভাবেই আমরা শুটিং সারলাম, দিনের আলো থাকতে থাকতে শুটিং শেষ করতে হবে যে!

ফিল্ম স্ক্রিনিং-এর পর রায় স্যর ঠিক এই জায়গাটায় ধরলেন। মেকআপের খুঁটিনাটি আমাকে বোঝালেন। সেদিন আরও ভাল করে অনুভব করলাম দৃশ্যের মুড অনুযায়ী মেকআপ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

রায় স্যরের কথা বলে শেষ করা যাবে না। ফিল্মস্কুলের কত কথাই বাদ রয়ে গেল। আমাদের ফিল্মস্কুলের প্রতিটি দিন, প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। তাঁকে বাদ দিয়ে আমার, আমাদের প্রথম ব্যাচের ফিল্মস্কুল-জার্নি ঢাল-তলোয়ারহীন সৈনিকের মতো, অবশ্যই।

                                                                                            চলবে…  

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

ছবি সৌজন্য: ইন্টারনেট এবং রূপকলা কেন্দ্র আর্কাইভ  

*** ছবির শিক্ষার্থীরা রূপকলা কেন্দ্র-র প্রথম ব্যাচের।