আমি ও আমার ‘রায় স্যর’, সৌমেন্দু রায়
মৌসুমী বিলকিস
দ্বিতীয় পর্ব
চেনা শোনার বাইরে
সময়, কেমন করে যেন আঙুলের ফাঁক গলে বেরিয়েই যেতে থাকে; আর আমরা, বিমূঢ় হতচকিত আমরা স্থির হয়ে দেখি, মুঠো মুঠো স্মৃতির পাহাড় জমে ওঠে চারপাশে, হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে নিই বেঁচে থাকার রসদ, এইসব স্মৃতির ভেতর থেকে যায় কিছু আলোর ঝলক মাখানো মুহূর্তও, সেরকমই রায় স্যরের স্মৃতি।
রায় স্যর, সত্তর পার করেও ঈর্ষনীয় রকমের ফিট রায় স্যর, আমাদের ভেতর চারিয়ে দেন আলোর ঝলক, আমরা গুটি গুটি পা ফেলে চলতে শুরু করি, চলতে চলতে ফিরে যাই তাঁর কাছে, বালীগঞ্জের ফ্ল্যাটে কখনও বা রূপকলা কেন্দ্রে গিয়ে ছুঁয়ে আসি তাঁর সান্নিধ্য; শুধু আমি নই, আমার সহপাঠীরাও।
বাতাসে ভর করে ভেসে আসে মিষ্টি এক সুবাস, আমরা বুঝতে পারি রায় স্যর পাইপ ধরিয়েছেন, তামাকের গন্ধ তাঁর মতোই পরিশীলিত, পাইপ মুখে স্যরকে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, তামাকের সুবাস মিশে যায় আমাদের প্রাত্যহিক ঘ্রাণে।
আমার একটু সময় লেগে যায়, স্যরের ফিটনেসের রহস্য জানতে। আমাদের সহপাঠী গঙ্গাপ্রসাদ স্যরের ওপর তথ্যচিত্র বানাবে ঠিক করে, ওর তোলা ফুটেজে দেখি উপযুক্ত পোশাকে স্যর ভোরবেলা বেরিয়ে পড়েছেন শরীর চর্চায়, এটাই রোজকার বাঁধা রুটিন তাঁর। অবাক না হয়ে উপায় আছে?
হঠাৎ করেই কোথাও দেখা হয়ে গেলে এগিয়ে আসেন নিজেই; কুশল বিনিময়, ব্যক্তি জীবনের খবর, কাজের খবর, সহপাঠীদের খবর নিতে ভোলেন না। আমরা আপ্লুত হয়ে আলোচনা করি তাঁর এই সহজ ও ঋজু ব্যক্তিত্ব।
একদিন তিনি কথার মাঝেই বলে ওঠেন, ‘তোমাদের ব্যাচটা একেবারে অন্যরকম ছিল।’, রূপকলা কেন্দ্রর প্রথম ব্যাচের কথা বলছেন বুঝতে পেরে বলি, ‘কিন্তু স্যর, আমাদের পরের শিক্ষার্থীরা কতকিছু জেনেই পড়তে এসেছে! টেকনিক্যালি অনেক স্ট্রং। সেই অর্থে আমরা কিছুই জানতাম না। এখান থেকে পড়াশোনা করে কত ভাল জায়গায় কাজ করছে, অনেক মায়নে পাচ্ছে। ভালই তো।’ স্যর পাইপে একটা টান দিয়ে বলেন, ‘সেসব ঠিকই আছে, কিন্তু তোমাদের মধ্যে একটা ইনোসেন্স ছিল।’
হয়তো তিনি অনেককেই একথা বলে থাকবেন। কিন্তু একথার মধ্যে কাউকে ব্যথা দেওয়ার কোনও ইচ্ছে স্যরের ছিল না, নিশ্চিত বলা যায়। এটা তাঁর উপলব্ধি, আমাদের গুটিকয় শিক্ষার্থীর বিষয়ে। এটুকু বলতে পারি, আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে শিক্ষক, অশিক্ষক এবং আরও যাঁরা রূপকলার প্রতিদিনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন প্রত্যেকেই আমাদের সবার নাড়ি নক্ষত্রর খবর রাখতেন, এমনকি আমরা নিজেদের বিষয়ে যা জানতাম তার থেকেও আমাদের বিষয়ে বেশিই বুঝতেন তাঁরা। স্যরের এই উপলব্ধি হয়তো তারই বহি:প্রকাশ। কিন্তু আমরা নিজেদের কখনও 'ইনোসেন্ট' ভাবিনি।
একদিন সত্যজিৎ রায়ের বিষয়ে এক আলোচনাসভা, বাংলা অ্যাকাডেমির সভাঘরে, মঞ্চে দেখি রায় স্যর, সভা শেষে স্যরকে ঘিরে এতজন যে আমি বাইরে বেরিয়ে আসি, কিছুক্ষণ পর উনি বাইরে এসে আমাকে দেখেই আমার কাছটিতে এসে দাঁড়ান, কুশল বিনিময়ের মাঝখানেই এক আলোকচিত্র শিকারি তাঁর ছবি তুলতে চায়, তিনি রাজি, কিন্তু, ‘এই যে, ও মৌসুমী, আমার ছাত্রী, ওর সঙ্গেই ছবি তুলুন’ বলেই আমার পাশে দাঁড়ান তিনি। অগত্যা ছবি শিকারি আমার সঙ্গেই তাঁর ছবি তোলেন।
এইসব টুকরো মুহূর্ত আজ মনে পড়ছে বার বার। মনে পড়ছে আমাদের কোনও আব্দার উনি সহজে উপেক্ষা করতেন না। আমাদের ফিল্মস্কুলের সহপাঠী শুভঙ্কর অ্যানিমেশন শেখানোর স্কুল খুললো, উদ্বোধনের দিন রায় স্যরকে তার চাই, স্যর ঠিক পৌঁছে গেলেন, সেই বালিতে, আর আমাদের কয়েকজনকে একসঙ্গে দেখে কি খুশি যে হলেন।
ফিল্মস্কুল শেষ করার পর স্যরের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করলে ঠিকই সময় দিতেন, রূপকলায় বা বালীগঞ্জের ফ্ল্যাটে ডেকে নিতেন আমাদের।
একদিন ফোন করলাম স্যরকে, কী মাছ খেতে ভালবাসেন জানতে চায়লাম, ‘সবই খাই, কিন্তু ছোট মাছ বাড়িতে হয় না’, বললেন তিনি, দু রকমের ছোট রান্না মাছ নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে গেলাম তাঁর ফ্ল্যাটে, ধবলদা মাছগুলো রান্নাঘরে গুছিয়ে রাখলেন, তখনও স্যরের দুপুরের খাওয়ার সময় হয়নি। ধবলদার বানানো চা খেয়ে নানান গল্পগুজব শেষে স্যরকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম।
ওমা! সেদিনই সন্ধ্যাবেলা স্যরের ফোন। মাছ কত সুস্বাদু হয়েছে সেটা নিয়েই বললেন মূলত। তারপর যেখানেই দেখা হয়েছে তাঁকে ঘিরে দাঁড়ানো লোকজনকে ‘শোন, মৌসুমী আমাকে মাছ রান্না করে খাওয়ায়…’, যেন খাওয়ানোটা ঘটমান বর্তমান! এতবার এরকম করেছেন, লজ্জাই পেত আমার। একদিন স্যরকে বললামও এমন করে না বলতে। উত্তরে, ‘না, দেখ কিছু জিনিস বার বার বলতেই ভাল লাগে…’, ইত্যাদি বলে আমার আপত্তিকে পাত্তাই দিলেন না।
এই অভিজ্ঞতা আমার একার নয়, তাঁর অনেক শিক্ষার্থীই এরকম অনেক ঘটনা মনে করতে পারবেন। অনেকেই তাঁর জন্য রান্না বা কেনা খাবার নিয়ে যেতাম আমরা। ফোনে জেনে নিতাম কী খেতে ইচ্ছে করছে, তিনি বলতেনও। পারস্পরিক একটা অধিকার বোধও তৈরি হয়েছিল আমাদের অনেকের সঙ্গে তাঁর, সেজন্যই বোধহয় নির্দ্বিধায় এরকম করে বলতে পারতেন, আর আমাদের কাছেও খুব স্বাভাবিক ঠেকতো তা।
একবার ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর ‘রোববার’-এর একটা সংখ্যার বিষয় ছিল ‘চিরকুমার’। এই সংখ্যায় রায় স্যরের লেখাও ছিল। আমার গোছা গোছা বইপত্রর ভেতর সংখ্যাটা কোথাও লুকিয়েছে, আপাতত খুঁজে পাচ্ছি না। স্পষ্ট মনে আছে লেখাটায় তিনি শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে রোম্যান্সের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
লেখাটা বেরনোর পর স্যরের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। যেমন অনেকের লেখা পড়ে বলি, স্যরকেও বললাম, লেখাটা পড়েছি। উনি এমন লজ্জা পেয়ে হাসতে লাগলেন যে আমি অপ্রস্তুত। দেখলাম, তাঁর মুখ জুড়ে বিগত দিনের আলোছায়া খেলে বেড়াচ্ছে, এক লহমার জন্য। এই স্যর আমার কাছে অভিনব। লেখাটা নিয়ে তাঁকে আর একটা কথাও বলিনি, তখনও না, আর কখনও না।
আমার পরিবারের এক সদস্যর হার্ট অ্যাটাকের খবর কোথাও থেকে তিনি শুনেছেন। একদিন ফোনে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেন। খুবই বিমর্শ হয়ে বললেন, ‘আমার কাছে এরা বাচ্চা। তাদের এরকম খবর শুনতে একদম ভাল লাগে না।’ এর দু'তিন বছর বাদে সেই আপনজনের মৃত্যুর খবর স্যরকে দিতে পারিনি।
তাঁর একটা বই প্রকাশ হয়েছে, ‘চলচ্চিত্র চলচ্চিত্র’। বইটা তখনও আমার সংগ্রহ করা হয়নি। একটা কাজে এমন জড়িয়ে আছি যে নিজের জন্য এতটুকু সময় নেই। তার মধ্যেই একদিনের অবসর পেয়ে একদিন স্যরের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। দেখি তিনি বসার ঘরের কেদারায় শুয়ে আছেন, পা দুটো গদি মোড়া একটা লম্বাটে টুলের ওপর। চেহারা আগের থেকে একটু ভেঙে গেছে। দাঁতের সমস্যার জন্য সব কথা ভাল করে বোঝা যাচ্ছে না। আমাকে দেখে চোখ দুটো তাঁর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যেমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেই হয়, অনেক কথা বলতে চান, কখনও বা একেবারে চুপ করে যান।
‘চলচ্চিত্র চলচ্চিত্র’ বইটার কথা উল্লেখ করতেই আমাকে এক কপি দিলেন, ধবলদা এনে দিলেন পাশের ঘর থেকে। আমি আব্দার করলাম, ‘স্যর, কিছু লিখে দেবেন না?’ বললেন, ‘পরে লিখে দেব, তুমি বইটা আবার নিয়ে এসো।’ তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। মত পাল্টালেন। বইটা চেয়ে নিয়ে অনেকটা সময় ধরে লেখা শেষ করতে পারলেন, ‘S Ray’। তাঁর হাত কাঁপছে, আর কিছু লিখতে পারলেন না।
সব মিলিয়ে শিশুর মতো অসহায় লাগছে তাঁকে। একথা মনে হতেই কিছুক্ষণ জড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে, নির্দ্বিধায় বললাম। ‘দাঁড়াও’ বলে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলেন। মেঝের ওপর এক হাঁটু মুড়ে কেদারার পাশে বসে কিছুক্ষণ তাঁকে জড়িয়ে থাকলাম। তিনি ধীরে ধীরে তাঁর গাল আমার মাথার ওপর স্থাপন করলেন। তিনি আমার রায় স্যর, নাকি এক শিশু- গুলিয়ে যাচ্ছে আমার।
আরও একটা আব্দার করলাম, এভাবেই একটা ছবি তোলার, স্যর তাতেও রাজি। ধবলদা আমাদের সেই ছবি তুলে দিলেন। তাঁর মাথার দিকের জানলাটা তখন বাইরের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। আমার সস্তার মোবাইল ক্যামেরা সেই আলোর স্রোতের সামনের মানুষ দুজনকে যে খুব ভাল ধরে রাখতে পারলো তা নয়।
স্যরকে এবার শুয়ে পড়তে বললাম, অনেকক্ষণ বসে আছেন। বাধ্য শিশুর মতো শুয়ে পড়লেন। বিদায়ের সময় বললেন, ‘তোমরা এলে ভাল লাগে।’
স্যরের শরীর আর কোনদিনই ঠিক হয়নি। অনেকের মতোই স্যরের এই অচল হয়ে যাওয়া আমিও মেনে নিতে পারিনি। করোনা, পেশা বিপর্যয়, দুই লক ডাউনের মাঝখানে পারিবারিক সদস্যদের মৃত্যু; সব মিলিয়ে গভীর অবসাদ আমাকে স্যরের কাছে যেতে দেয়নি। গেলে কিছুই লুকোতে পারতাম না। আর ওইরকম মানসিক অবস্থায় স্যরের আরও শারীরিক অবনতি নিতে পারতাম বলেও মনে হয় না।
হয়তো
ভালই হল, দীর্ঘ দিনের যন্ত্রণামুক্তি হল। কিন্তু বেদনা বেদনার মতোই বুকে বাজে।
(শেষ)
-----------------------------------------------------------------------------------------------
ছবি সৌজন্য: ইন্টারনেট এবং নিজের অ্যালবাম




No comments:
Post a Comment