মেঘবালিকার ঘর বাহির
মৌসুমী বিলকিস
দেবলীনার পরিচিতি কোনও একটা গণ্ডির মধ্যে ধরা যায় না। কখনও তাঁর লেখা দেখি গুরুত্বপূর্ণ বাংলা দৈনিকের প্রচ্ছদ জুড়ে, কখনও তথ্যচিত্র পরিচালনা করে নিয়ে আসেন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার, আবার কাহিনিচিত্র বানিয়েও চমকে দেন তিনি। আর প্রতিটি ফিল্মেই থাকে তাঁর গভীর চিন্তার অনুরণন। আবার কখনও কবিতা বা গানের কথা লিখে আচ্ছন্ন করে দেন পাঠক ও শ্রোতাকে।
এই শহরে যে কজন স্টিল ফটোগ্রাফি এবং সিনেমাটোগ্রাফিতে হাত পাকিয়েছিলেন সেই অ্যানালগের যুগ থেকেই, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। লিঙ্গ অসাম্যের জায়গা থেকে যদি দেখি, তাহলে উল্লেখ করতেই হয় এই শহরে রানু ঘোষের মতো সিনেমাটোগ্রাফারের পরেই আসে তাঁর নাম, যারা মেয়ে হিসেবে সিনেমাটোগ্রাফিতে প্রথম হাত পাকিয়েছিলেন এবং স্বাতন্ত্রের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, রাখছেন। কিন্তু শুধু ‘মেয়ে সিনেমাটগ্রাফার’ বললে একটু ভুলও হবে, যে কোনও প্রথম সারির সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে তাঁদের নামও থেকে যাবে একই আসনে, দক্ষতার নিরিখে, এই সত্যটাও উপলব্ধি করা জরুরি। তাঁদের শুরুটা এখনকার মতো সহজ ছিল না (এখনও খুব সহজ নয় যদিও)। ইকুইপমেন্ট হাতের কাছে পাওয়াটাও ছিল বেশ এক্সপেনসিভ। তবুও লড়াই জারি রেখেছেন দুজনেই।
অন্যদিকে লিঙ্গসাম্য নিয়েও দেবলীনা কাজ করছেন বহুদিন, ‘স্যাফো ফর ইকুয়ালিটি’-র অধ্যায় জুড়ে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর প্রচেষ্টা এখন আর অজানা নয়। এলজিবিটিকিউ কমিউনিটি তাঁদের দাবি দাওয়া, সুখ দুঃখ শেয়ার করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নিয়েছেন স্যাফোর হাত ধরেই। এ ছাড়াও বিভিন্ন গণ সাংস্কৃতিক এবং গণ আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত দেবলীনা।
দেবলীনা নিজের কাজের প্রদর্শনী করবেন ভাবেননি কখনও, নিজেই জানালেন। ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি, ইউ কে এবং ইন্সটিটিউট অফ ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা-র উদ্যোগেই তাঁর স্টিল ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়ে গেল আইসিসিআর-এর অবনীন্দ্র ঠাকুর গ্যালারিতে, গত ৭ এবং ৮ ডিসেম্বর। বিষয় ‘জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড এভরিডে রেসিলিয়েন্স’ (Gender Justice and Everyday Resilience: Domestic Violence in West Bengal)।
কিছু কিছু মানুষের থাকে পৃথিবী পাল্টে দেওয়ার বাসনা। দেবলীনার ভেতর পুরো মাত্রায় আছে সেই পাগলামি। এই পাগলগুলোর জন্যই পৃথিবী এখনও হয়ে আছে বাসযোগ্য।
তাঁর সিনেমাটোগ্রাফিতে আমরা পেয়েছি অসম্ভব আর্টিস্টিক সব দৃশ্য। তাঁর স্টিল ছবিতেও পাওয়া গেছে সেসব। কিন্তু এই প্রদর্শনীর স্থির চিত্রগুলিতে তিনি খুব সচেতনভাবেই দৃষ্টিনন্দন আর্ট থেকে সরে এসেছেন। বিষয়ের দাবি থেকেই সম্ভবত তাঁর এই ভাবনা। একটা ভায়োলেন্ট বিষয়কে নন ভায়োলেন্ট ভঙ্গীতে প্রকাশ করা যায় এই প্রদর্শনী তা দেখিয়ে দিয়েছে। প্রায় সব ছবিতেই মেয়েদের মুখ আবছা বা পিছন থেকে দেখছি তাদের বা রঙের পিক্সেল ভেঙে ভেঙে যেন বা নিরুদ্দেশ হতে চায় মুখগুলি, যেন তাদের অস্তিত্ব চলে গেছে আবডালে। কখনও বা মাস্কের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার ক্ষতচিহ্নসকল। সে পিতৃ গৃহেই হোক বা স্বামীর বাড়ি বা সহবাসী হোক কারও সঙ্গে; এই যন্ত্রণা নিরবচ্ছিন্ন। শ্রদ্ধার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যে মেয়ে যন্ত্রণা সয়েও বাঁচাতে চেয়েছিল একটি প্রায় ভেঙে পড়া সম্পর্ক। খুন হয়ে যার মূল্য দিতে হল তাকে।
ছবিগুলিতে বিশেষ বিশেষ রঙের টোন যেমন যন্ত্রণার আবহ তুলে ধরে তেমন তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাকেও ইঙ্গিত করে। তাই দু একটা ছবিতে মন ভাল করে দেওয়া গোধূলি আকাশের রঙ বা যে কোনও আলো যেন একটানা করুণ গোঙানিতে পরিণত হয়, যেমন করে বিদায় বেলায় বাজে ওস্তাদ বিসমিল্লার সানাই, যেন যত্নে সাজিয়ে রাখা সিস্টেমের শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়ার কান্না মিশে থাকে সেইসব রঙে।
ছবিগুলির সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট লেখায় বালিকা ও মেয়েদের অসহনীয় যন্ত্রণা এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার নিরন্তর চেষ্টা লিপিবদ্ধ। যে কোনও অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে প্রতিটি মেয়েই লেখাগুলোর সঙ্গে নিজেদের অনুষঙ্গ খুঁজে পাবেন।
প্রদর্শনীর আবহ হিসেবে চলেছে অডিও ইন্সটলেশন, মেয়েদের সাক্ষাৎকার। স্বল্প সাধ্যে এই ইন্সটলেশনও দেবলীনার প্রথম কাজ। এই ইন্সটলেশন মেয়েদের যন্ত্রণার আখ্যান হয়ে প্রদর্শনীর হৃৎপিণ্ড ধরে রেখেছে যেন। মেঝের ওপর দাঁড় করানো সাদা কাগজে লেখা সাক্ষাৎকারের টুকরো টুকরো অংশ দর্শকদের সঙ্গে একটা নিবিড় যোগাযোগ তৈরি করে।
দেবলীনার
কয়েকটি ছবিতে অর্চি রায়ের মিক্স মিডিয়া ছবিগুলিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। মিক্স মিডিয়াগুলোতে
কখনও সুতোর ফোঁড়ে, কখনও ছবির ওপর রঙের স্ট্রোকে, কখনও কোলাজের ছোঁয়ায় যেন ফুটে উঠেছে
নিরন্তর অসহনীয়তা পেরিয়ে উত্তরণের প্রয়াস। তরুণ শিল্পী অর্চির কাজ আশা জাগিয়ে রাখে।
যে মেয়েটি গার্হস্থ্য হিংসার বলি হয়ে অচ্ছেদ্য অন্ধকারের ভেতর ডুবে যেতে যেতে জেগে
ওঠে, আর নিজের সামান্য গয়না বেচে কিনে ফেলে একটি সাইকেল, আর সাইকেলে চড়ে কাজে যাওয়ার
রাস্তা দু পাশে সবুজ নিয়ে আপন করে নেয় তাকে, তখন তার মনে হয় এই তো, এই তার মুক্তির
জায়গা, যেখান দিয়ে যেতে যেতে সে খুঁজে পায় নিজের এক টুকরো আকাশ, মেঘবালিকা-ই হয়ে ওঠে
সে। অর্চির মিক্স মিডিয়ায় এই মেঘবালিকাদের আশা, স্বপ্ন ও বাস্তব।
হলুদ-শাড়ি
মেয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চলে গরুর দঙ্গল। তার পায়ের নীচে কঠিন কঠোর পৃথিবী। ঠোক্কর খেতে খেতে
সেই পৃথিবীকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে চলে তার সস্তার চপ্পল। শেষমেশ
জিতে যায় মেয়ে, অনেক পরাজয়ের গ্লানি কাঁধে নিয়ে। তার চারপাশে জেগে থাকে ভয় ধরানো রুক্ষ
ও হৃদয়হীন পাথুরে অঞ্চল আর তাতে চড়া হয়ে জেগে থাকা বিষাদ রঙ যেন অবচেতনের এক ভয়ঙ্কর
অঞ্চল।
আরেক
ছবিতে দেখি ফোরগ্রাউন্ডে অত্যন্ত মগ্ন হয়ে ঘরকন্যায় ব্যস্ত ঘোমটা মাথায় মেয়ে। কিন্তু
তার ঘাড়ের কাছেই থাকে পুরুষতন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন পাহারা, তাই ছবির ফোকাস থাকে পাহারারত
লোকটির অবয়বে। বলে রাখা ভাল, এখানে ব্যক্তি মানুষ প্রতীকী, একটি লোক যার মুখ দেখা যায়
না কিন্তু খণ্ডিত দেহ ভঙ্গিতেই ছাপ রেখে যায় তার কর্তৃত্বের ইশারা। ফলে হয়ে ওঠে সে
পুরুষতন্ত্রের প্রতীক।
চেয়ারে
পা তুলে বসে থাকা এক কর্তৃত্বকামী পুরুষের সামনে দিয়ে স্কার্ট দুলিয়ে প্রায় নাচের ভঙ্গিতে
হেঁটে যায় এক বালিকা। সে কি পারছে নিজের মতোই হেঁটে যেতে? নাকি তাকে মেপে নিচ্ছে কর্তৃত্বের
চোখ? তার উড়ে যাওয়া স্কার্টে আটকে আছে লোলুপ চোখ নাকি নীতি পুলিশি কর্তব্যে উড়ে যাওয়া
স্কার্ট ধরে কেউ ঢেকে দিতে চাইছে তার বেয়াড়া পা জোড়া? এই ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায়
ইরানের হিজাব বিরোধী আন্দোলন, মনে পড়ে যায় রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়া মাহশা আমিনির মুখ।
সবখানে, সব দেশে, সব কালে এক অসহনীয় কর্তৃত্বের অসহ ভারে নুয়ে পড়ে বালিকারা, মেয়েরা।
তবু থামে না স্কার্ট উড়িয়ে উড়ানের বাসনা, স্বপ্ন ও বাস্তব।
এত বাধা
সত্বেও ছাপ রেখে যায় অবহেলিত লিঙ্গও। সমুদ্র তট জুড়ে তাই একটি ছবিতে অসংখ্য পায়ের চিহ্ন।
এইসব বিরামহীন পা ধরা দেয় না লক্ষ্ণীর প্রতীকে, অলক্ষ্ণীই হবে তারা, ঘরের দিকে পায়ের
আঙুল ফেরানো নেই যেন, পায়ের চিহ্নগুলো হেঁটে যায় অনিশ্চিত বিশ্বের খোলা প্রান্তরে,
ভয়গুলো জয় করে নিতে নিতে, যন্ত্রণার ক্ষত সারিয়ে
তুলতে তুলতে।
---------------------------------------------







No comments:
Post a Comment