Total Pageviews

Wednesday, 21 July 2021

সোনিয়ার বক্‌রি ইদ

 

সোনিয়ার বক্‌রি ইদ

মৌসুমী বিলকিস


সোনিয়ার সারা শরীরে কাঁচা মাংসের গন্ধ।      

: মা, আমার আর ভাল্লাগছে না।

: আচ্ছা, তুই উঠে পড়বাকিটা আমি...

: না, তুমি একা এত...

একটা বড় প্লাস্টিক সিটের ওপর রাখা কাঁচা মাংসের স্তূপ। তাজা, লালচে। সামনে ব’সে সোনিয়া। ঠিক ব’সে নেই, মাংস টুকরোগুলির গায়ে লেগে থাকা নোংরা পরিষ্কার করছে; লোম, কাঠের টুকরো, জমাট বাঁধা রক্ত বেছে বাছা মাংস আলাদা করছে লোমের রঙ দেখে সে বোঝার চেষ্টা করছে নিহত পশুটির গায়ের রঙ, চর্বি স্তরের অপরূপ বিন্যাস দেখে অভিভূত হচ্ছে যেন স্বচ্ছ্ব সাদা ফেব্রিকের ওপর ঘন সাদার ডিজাইন, মাকে দেখাচ্ছে।

সেই সকাল থেকে ক্রমাগত মাংস দিয়ে যাচ্ছে লোকে, ছাগল ও গরুর নিজেদের কোরবানির মাংসও অনেক। মা একের পর এক রান্না করে যাচ্ছে; সিমুই, লাচ্ছা, পরোটা, ছোলার ডাল, পোলাও, কড়া করে পেঁয়াজ ভাজা মাংস রান্না চাপিয়েছে মা, সময় লাগবে। সেই অবসরে মাংস বাছাইয়ে হাত লাগিয়েছে।

 

আব্বা গতকাল সন্ধ্যেয় দোকান থেকে এনেছে নানান রকম মিষ্টি। আজ মিষ্টির দোকান প্রায় খালি। আজ সকাল থেকে বাড়ির ছেলেরা ব্যস্ত, কোরবানি নিয়ে বধ্যভূমিতে যাওয়া, মাংস টুকরো করিয়ে নিয়ে আসা, আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশীদের দিয়ে আসা, কত কাজ

 

অনেকগুলো এঁটো বাসন জমে গেছে। যারা মাংস দিতে আসছে প্রত্যেককেই কিছু না কিছু খেতে দিচ্ছে মাঅনেকেই তাড়া আছে বলে খাইনি ঠিকই তারপরেও এঁটো বাসনের সংখ্যা কম নয়। সন্ধ্যে অব্দি মাংস দিতে আসবে লোকে। কাজের মেয়ে আজ আসবে না। তাকে পরবের ছুটি দিয়েছে মা সময় করে একবার খেতে আসতে বলেছে তাকে।

 

: মা, সারা শরীর ব্যথা হয়ে গেছে।

: আহা রে! উঠে পড়। এই রান্নাটা শেষ করেই আমি...

: এমন করছো যেন তোমার কিছু হয়নি!

: হলেই কি আর ছাড়া পাবো রে মা!

: তোমার হাতে পায়ে আগে থেকেই ব্যথা, আমি জানি।

: চুপ কর, এতকিছু বলতে নাই।

: রাতে তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে না দৌড়তে হয়।

: কিছু হবে না। তুই ওঠ।

: খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে

: পরোটা খেয়ে গোসল করতে যা।

: না, গায়ে মাংসের গন্ধ, ঘেন্না করছে

: তো ওঠ, গোসল করে নতুন জামাটা পর

: হুঁ! তুমি একা একা কাজ করবে আর আমি...

: দাঁড়া, মাংসটা নেড়ে দিয়ে আসি।

: এখনো কত মাংস গো মা!

: এই, এসব বলতে নাই।

: বেলা পড়ে এলো। দুপুরের খাবার এখনো...

: তোর আব্বা আর ভাই ঠিক কারো বাড়ি ভাত খেয়ে আসবে।

: তোমার আমার খেতে অনেক দেরি।

: তুই খেয়ে নে না।

: তোমাকে ছাড়া খাবো না।

: আমার কি একটা কাজ যে তোর সঙ্গে..., আমার খেতে খেতে সন্ধ্যে পার।

: মা, এত মাংস কী হবে? অযথা...

: ছি ছি ছি! কুরবানির মাংস নিয়ে এমন কথা...

: দেখ, আমার হাত দুটো কালচে রক্তে ভর্তি।

: যা, উঠে পড়। গোসল কর।

: মা, এক কথা বার বার বোলো না তো। ভালো করেই জানো যে...

: নারে, একলাই পারবো। করি না, তুই যখন থাকিস না?

: অফিসের যা চাপ, সব ইদে কি আসা যায় গো? মাত্র একদিনের ছুটি, এত দূরের রাস্তা। তোমার কষ্ট হবে বলে তাও আমি...

: মাংসটা এখনো ডাটো হয়ে আছে। সিদ্ধ হতে সময় লাগবে।

: আজ কত জবাই হল বলো তো মা? সবার হাতে টাকা আর সবাই কুরবানি দিচ্ছে।

: তো দিবে না? নিয়ম তো তাই।

: দিতে কে আটকাচ্ছে? শুধু হিসেব করে যতটুকু দরকার ততটুকু দিলেই তো... সবাই মিলে কুরবানি না দিয়ে বাকি টাকা বন্যাত্রানে বা প্রতিবেশী গরীবদের...

: কী বকছিস পাগলির মতো!

: গা গুলাচ্ছে...

: শরীর খারাপ করলো নাকি? কিছু খাসনি যে সকাল থেকে।

: না মা, লাচ্ছা খেয়েছি। মাংসের গন্ধে...

: হে হে হে... মাংস খাওয়া ছেড়ে দিবি নাকি?

: ছাড়বো না হয়তো, কিন্তু এত মাংস, কাঁচা গন্ধ...

: গরু কাটা তো বন্ধই করে দিয়েছে কুথায় কুথায়। যত সব হেঁদুগিরি!

: হুঁ...আব্বার হিন্দু বন্ধুরা খেতে আসবে?

: হ্যাঁ, পুলাও ভাত আর গরুর মাংস।

: মাংসটা দেখো যেন টেস্টি হয়।

: আশা তো করছি।

 

সোনিয়া ও তার মা রান্নাঘর সামলে রাত দেড়টায় বিছানায় এলিয়ে পড়ে। একটা আনকোরা শাড়ি ও সালোয়ার কামিজ পড়ে থাকে ওয়ারড্রবে

-----------------------------------------

রচনাকাল: ২০১৭; 'একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা' গল্পগ্রন্থের অন্তর্গত। 

                                                   ব্যবহৃত ফটোগ্রাফ: লেখক