Total Pageviews

Friday, 9 December 2022

মেঘবালিকার ঘর বাহির

 

  মেঘবালিকার ঘর বাহির  

মৌসুমী বিলকিস

                                                         


দেবলীনার পরিচিতি কোনও একটা গণ্ডির মধ্যে ধরা যায় না। কখনও তাঁর লেখা দেখি গুরুত্বপূর্ণ বাংলা দৈনিকের প্রচ্ছদ জুড়ে, কখনও তথ্যচিত্র পরিচালনা করে নিয়ে আসেন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার, আবার কাহিনিচিত্র বানিয়েও চমকে দেন তিনি। আর প্রতিটি ফিল্মেই থাকে তাঁর গভীর চিন্তার অনুরণন। আবার কখনও কবিতা বা গানের কথা লিখে আচ্ছন্ন করে দেন পাঠক ও শ্রোতাকে।

এই শহরে যে কজন স্টিল ফটোগ্রাফি এবং সিনেমাটোগ্রাফিতে হাত পাকিয়েছিলেন সেই অ্যানালগের যুগ থেকেই, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। লিঙ্গ অসাম্যের জায়গা থেকে যদি দেখি, তাহলে উল্লেখ করতেই হয় এই শহরে রানু ঘোষের মতো সিনেমাটোগ্রাফারের পরেই আসে তাঁর নাম, যারা মেয়ে হিসেবে সিনেমাটোগ্রাফিতে প্রথম হাত পাকিয়েছিলেন এবং স্বাতন্ত্রের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, রাখছেন। কিন্তু শুধু ‘মেয়ে সিনেমাটগ্রাফার’ বললে একটু ভুলও হবে, যে কোনও প্রথম সারির সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে তাঁদের নামও থেকে যাবে একই আসনে, দক্ষতার নিরিখে, এই সত্যটাও উপলব্ধি করা জরুরি। তাঁদের শুরুটা এখনকার মতো সহজ ছিল না (এখনও খুব সহজ নয় যদিও)। ইকুইপমেন্ট হাতের কাছে পাওয়াটাও ছিল বেশ এক্সপেনসিভ। তবুও লড়াই জারি রেখেছেন দুজনেই।   

অন্যদিকে লিঙ্গসাম্য নিয়েও দেবলীনা কাজ করছেন বহুদিন, ‘স্যাফো ফর ইকুয়ালিটি’-র অধ্যায় জুড়ে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর প্রচেষ্টা এখন আর অজানা নয়। এলজিবিটিকিউ কমিউনিটি তাঁদের দাবি দাওয়া, সুখ দুঃখ শেয়ার করার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নিয়েছেন স্যাফোর হাত ধরেই। এ ছাড়াও বিভিন্ন গণ সাংস্কৃতিক এবং গণ আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত দেবলীনা।                                                    


দেবলীনা নিজের কাজের প্রদর্শনী করবেন ভাবেননি কখনও, নিজেই জানালেন। ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি, ইউ কে এবং ইন্সটিটিউট অফ ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা-র উদ্যোগেই তাঁর স্টিল ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়ে গেল আইসিসিআর-এর অবনীন্দ্র ঠাকুর গ্যালারিতে, গত ৭ এবং ৮ ডিসেম্বর। বিষয় ‘জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড এভরিডে রেসিলিয়েন্স’ (Gender Justice and Everyday Resilience: Domestic Violence in West Bengal)।

কিছু কিছু মানুষের থাকে পৃথিবী পাল্টে দেওয়ার বাসনা। দেবলীনার ভেতর পুরো মাত্রায় আছে সেই পাগলামি। এই পাগলগুলোর জন্যই পৃথিবী এখনও হয়ে আছে বাসযোগ্য।   

তাঁর সিনেমাটোগ্রাফিতে আমরা পেয়েছি অসম্ভব আর্টিস্টিক সব দৃশ্য। তাঁর স্টিল ছবিতেও পাওয়া গেছে সেসব। কিন্তু এই প্রদর্শনীর স্থির চিত্রগুলিতে তিনি খুব সচেতনভাবেই দৃষ্টিনন্দন আর্ট থেকে সরে এসেছেন। বিষয়ের দাবি থেকেই সম্ভবত তাঁর এই ভাবনা। একটা ভায়োলেন্ট বিষয়কে নন ভায়োলেন্ট ভঙ্গীতে প্রকাশ করা যায় এই প্রদর্শনী তা দেখিয়ে দিয়েছে। প্রায় সব ছবিতেই মেয়েদের মুখ আবছা বা পিছন থেকে দেখছি তাদের বা রঙের পিক্সেল ভেঙে ভেঙে যেন বা নিরুদ্দেশ হতে চায় মুখগুলি, যেন তাদের অস্তিত্ব চলে গেছে আবডালে। কখনও বা মাস্কের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার ক্ষতচিহ্নসকল। সে পিতৃ গৃহেই হোক বা স্বামীর বাড়ি বা সহবাসী হোক কারও সঙ্গে; এই যন্ত্রণা নিরবচ্ছিন্ন। শ্রদ্ধার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যে মেয়ে যন্ত্রণা সয়েও বাঁচাতে চেয়েছিল একটি প্রায় ভেঙে পড়া সম্পর্ক। খুন হয়ে যার মূল্য দিতে হল তাকে।                                            


ছবিগুলিতে বিশেষ বিশেষ রঙের টোন যেমন যন্ত্রণার আবহ তুলে ধরে তেমন তা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাকেও ইঙ্গিত করে। তাই দু একটা ছবিতে মন ভাল করে দেওয়া গোধূলি আকাশের রঙ বা যে কোনও আলো যেন একটানা করুণ গোঙানিতে পরিণত হয়, যেমন করে বিদায় বেলায় বাজে ওস্তাদ বিসমিল্লার সানাই, যেন যত্নে সাজিয়ে রাখা সিস্টেমের শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাওয়ার কান্না মিশে থাকে সেইসব রঙে।   

ছবিগুলির সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট লেখায় বালিকা ও মেয়েদের অসহনীয় যন্ত্রণা এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার নিরন্তর চেষ্টা লিপিবদ্ধ। যে কোনও অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে প্রতিটি মেয়েই লেখাগুলোর সঙ্গে নিজেদের অনুষঙ্গ খুঁজে পাবেন।

প্রদর্শনীর আবহ হিসেবে চলেছে অডিও ইন্সটলেশন, মেয়েদের সাক্ষাৎকার। স্বল্প সাধ্যে এই ইন্সটলেশনও দেবলীনার প্রথম কাজ। এই ইন্সটলেশন মেয়েদের যন্ত্রণার আখ্যান হয়ে প্রদর্শনীর হৃৎপিণ্ড ধরে রেখেছে যেন। মেঝের ওপর দাঁড় করানো সাদা কাগজে লেখা সাক্ষাৎকারের টুকরো টুকরো অংশ দর্শকদের সঙ্গে একটা নিবিড় যোগাযোগ তৈরি করে।

দেবলীনার কয়েকটি ছবিতে অর্চি রায়ের মিক্স মিডিয়া ছবিগুলিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। মিক্স মিডিয়াগুলোতে কখনও সুতোর ফোঁড়ে, কখনও ছবির ওপর রঙের স্ট্রোকে, কখনও কোলাজের ছোঁয়ায় যেন ফুটে উঠেছে নিরন্তর অসহনীয়তা পেরিয়ে উত্তরণের প্রয়াস। তরুণ শিল্পী অর্চির কাজ আশা জাগিয়ে রাখে। যে মেয়েটি গার্হস্থ্য হিংসার বলি হয়ে অচ্ছেদ্য অন্ধকারের ভেতর ডুবে যেতে যেতে জেগে ওঠে, আর নিজের সামান্য গয়না বেচে কিনে ফেলে একটি সাইকেল, আর সাইকেলে চড়ে কাজে যাওয়ার রাস্তা দু পাশে সবুজ নিয়ে আপন করে নেয় তাকে, তখন তার মনে হয় এই তো, এই তার মুক্তির জায়গা, যেখান দিয়ে যেতে যেতে সে খুঁজে পায় নিজের এক টুকরো আকাশ, মেঘবালিকা-ই হয়ে ওঠে সে। অর্চির মিক্স মিডিয়ায় এই মেঘবালিকাদের আশা, স্বপ্ন ও বাস্তব। 

                                                  


হলুদ-শাড়ি মেয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চলে গরুর দঙ্গল। তার পায়ের নীচে কঠিন কঠোর পৃথিবী। ঠোক্কর খেতে খেতে সেই পৃথিবীকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে চলে তার সস্তার চপ্পল। শেষমেশ জিতে যায় মেয়ে, অনেক পরাজয়ের গ্লানি কাঁধে নিয়ে। তার চারপাশে জেগে থাকে ভয় ধরানো রুক্ষ ও হৃদয়হীন পাথুরে অঞ্চল আর তাতে চড়া হয়ে জেগে থাকা বিষাদ রঙ যেন অবচেতনের এক ভয়ঙ্কর অঞ্চল।

                                                     


আরেক ছবিতে দেখি ফোরগ্রাউন্ডে অত্যন্ত মগ্ন হয়ে ঘরকন্যায় ব্যস্ত ঘোমটা মাথায় মেয়ে। কিন্তু তার ঘাড়ের কাছেই থাকে পুরুষতন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন পাহারা, তাই ছবির ফোকাস থাকে পাহারারত লোকটির অবয়বে। বলে রাখা ভাল, এখানে ব্যক্তি মানুষ প্রতীকী, একটি লোক যার মুখ দেখা যায় না কিন্তু খণ্ডিত দেহ ভঙ্গিতেই ছাপ রেখে যায় তার কর্তৃত্বের ইশারা। ফলে হয়ে ওঠে সে পুরুষতন্ত্রের প্রতীক।

                                                     


চেয়ারে পা তুলে বসে থাকা এক কর্তৃত্বকামী পুরুষের সামনে দিয়ে স্কার্ট দুলিয়ে প্রায় নাচের ভঙ্গিতে হেঁটে যায় এক বালিকা। সে কি পারছে নিজের মতোই হেঁটে যেতে? নাকি তাকে মেপে নিচ্ছে কর্তৃত্বের চোখ? তার উড়ে যাওয়া স্কার্টে আটকে আছে লোলুপ চোখ নাকি নীতি পুলিশি কর্তব্যে উড়ে যাওয়া স্কার্ট ধরে কেউ ঢেকে দিতে চাইছে তার বেয়াড়া পা জোড়া? এই ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় ইরানের হিজাব বিরোধী আন্দোলন, মনে পড়ে যায় রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়া মাহশা আমিনির মুখ। সবখানে, সব দেশে, সব কালে এক অসহনীয় কর্তৃত্বের অসহ ভারে নুয়ে পড়ে বালিকারা, মেয়েরা। তবু থামে না স্কার্ট উড়িয়ে উড়ানের বাসনা, স্বপ্ন ও বাস্তব।   

                                                 


এত বাধা সত্বেও ছাপ রেখে যায় অবহেলিত লিঙ্গও। সমুদ্র তট জুড়ে তাই একটি ছবিতে অসংখ্য পায়ের চিহ্ন। এইসব বিরামহীন পা ধরা দেয় না লক্ষ্ণীর প্রতীকে, অলক্ষ্ণীই হবে তারা, ঘরের দিকে পায়ের আঙুল ফেরানো নেই যেন, পায়ের চিহ্নগুলো হেঁটে যায় অনিশ্চিত বিশ্বের খোলা প্রান্তরে, ভয়গুলো জয় করে নিতে নিতে, যন্ত্রণার ক্ষত  সারিয়ে তুলতে তুলতে।

---------------------------------------------

 ছবি: সুস্মিতা 

  

 

       

Tuesday, 29 November 2022

একদিন মৃত্যু

 

  একদিন মৃত্যু 

মৌসুমী বিলকিস




                                 রাজা বিশ্বাস (২৮ ডিসেম্বর, ১৯৭৪- ৩০ নভেম্বর, ২০২০) 


ইন্সটিটিউট অফ নিউরো সায়েন্সেস (মল্লিক বাজার)-এ শেষ বিছানায় তুমি শুয়ে।

তোমার কাছে যাওয়ার জন্য সবাই বলছে আমাকে। যাব না, কিছুতেই যাব নাএ তুমি সে তুমি নও যাকে আমি দেখতে চাই 30 নভেম্বর রাত 9.55 তে সে তুমি চলে গেছ, চিরদিনের মতো, যে তুমিকে জড়িয়ে ছিল আমার সবকিছুই, ভাল এবং মন্দও 

তোমার দেহ কিছুতেই নিষ্প্রয়োজনের ছাই হয়ে যেতে পারে না, প্রবল শোকের ভেতর মনে পড়ে যায় আমার। আমরা দল বেঁধে গণদর্পণে নাম লেখাবো, মরণোত্তর দেহদানের বিষয়ে আগেই কতবার কথা বলেছি, কিন্তু কখনও সে উদ্যোগ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। ইচ্ছেটা এক বন্ধুকে জানালাম, কাঁদতে কাঁদতেই। তিনি উদ্যোগ নিলেন।

কিন্তু তোমার তথাকথিত গণ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ‘বিপ্লবী’ বন্ধুদের কয়েকজন ছাড়া কেউই আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন না। তোমার বাড়ির লোকেদের একজন হসপিটালের বাইরে দাঁড়িয়েই আমাকে যা-ইচ্ছে-তাই বলতে শুরু করলেন, আর কেউ কেউ খুব ভদ্রভাবেই আপত্তির কথা জানালেন। তোমার বাড়ির মানুষেরা কেউ কখনও তোমার মতো গণ সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন না। ফলে তাঁদের আপত্তিটা বুঝতে আমার কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু তুমি যাদের সঙ্গে এতদিন সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেছো তাঁদের আসল ‘বিপ্লবী’ রূপ আমার কাছে ধীরে ধীরে খুব নগ্নভাবেই প্রকাশিত হয়ে পড়লো, তোমার মৃত্যুর পর, এবং আমি খুব ভাল করেই জানি তুমি বেঁচে থাকলে আমার প্রতি এঁদের এই ধ্যাস্টামো এক ফোঁটা সহ্য করতে না।   

শেষমেশ তোমার কর্নিয়া দুটো দান করা গেল (দিশা আই হসপিটাল থেকে লোক এসে নিয়ে গেল তোমার কর্নিয়া যা দিয়ে তোমার মতো করেই কেউ পৃথিবীর আলো দেখছে, জীবন্ত হয়ে আছো তুমি), সে বিষয়ে তোমার বাড়ির মানুষেরা একমত হলেন বলে। তোমার মায়ের সম্মতি থাকায় মরণোত্তর দেহদানের বিষয়ে আর কারোর আপত্তি খাটলো না। কিন্তু কিছু বন্ধু অনেক চেষ্টা করার পরেও করোনা সংকটের কারণে কোথাও দেহ দান করা গেল না। সেই শ্মশানেই ছাই হয়ে গেলে তুমি।  

এই পুরো প্রসেসটাতে হসপিটালের কর্মীরা এবং ডাক্তাররা খুব সাহায্য করলেন।     

কিছুক্ষণ আগেই হসপিটাল থেকে ফিরেছি। তোমার মৃত্যুর খবর পেয়েই আবার হসপিটালে দৌড়েছি, আমাদের প্রিয় বন্ধু বনমালী আর ছোটবোন মনীষার সঙ্গে। তার আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, যখন একটা ট্যাক্সিও পাচ্ছি না, তিনজন পরস্পরকে জড়িয়ে প্রবল কাঁদছি। সবাই দেখছে জানি। কিন্তু কী করে আমরা সামলে রাখবো নিজেদের?

খুব অসুস্থ লাগছে। হসপিটালে পৌঁছে বমি করছি আর কাঁদছি। কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। কত পরে স্থির হতে পারলাম কিছুটা। আমাকে বন্ধু ও বাড়ির লোকেরা ধরে ধরে বসিয়ে দিয়েছেন একটা চেয়ারে। নিঃশব্দে কাঁদছি তখনও। ফারহা, ঝুম্পা, আমার ভাইবোন অনেক বলে অনুমতি পেয়ে হসপিটালের ভেতর ঢুকতে পেরেছে। আমাকে ঘিরে আছে সবাই। বাকিরা বাইরে অপেক্ষা করছে।   

তোমাকে দেখতে যাওয়ার অনুরোধ এতক্ষণ ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। কী করে দেখবো তোমার ওই শীতল হয়ে যাওয়া শরীর? কিন্তু এক সময় মনে হল কর্ণিয়া দুটো নিয়ে যাওয়ার আগে দেখে আসি তোমায়। এই করোনা আবহে একদিনও তোমার কাছ অব্দি আমি যেতে পারিনি, কেউ যেতে পারেনি। একা একাই কোমার ভেতর আচ্ছন্ন হয়ে ছিলে তুমি।

অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম বলে ছোট বোনকে আমার সঙ্গে তোমার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিল হসপিটাল।

কেমন দিলাম, মৌসুমী মুখ করে আইসিইউ-তে শুয়ে আছো তুমিকর্মী ছেলেটির অনুমতি নিয়ে তোমাকে স্পর্শ করছি, ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছি তোমার কপালে, গালে গালতখনও তোমার নাকে, গলায় নল, তখনও খানিক উষ্ণ হয়েই আছো তুমিওরা বললো চার ঘন্টা পর সব খুলে দেবে, নলও

                                           


তোমার শয্যার পাশে নিথর দাঁড়াই কিছুক্ষণ

তোমার হাতের পাতাদুটি বরফের মতো শীতলপাতা থেকে কনুইয়ের দিকে হাত বোলাচ্ছি কী উষ্ণ! যেন এক্ষুনি উঠে বসে আমাকে দু হাতে জড়িয়ে বুকে টেনে নিয়ে বলবে, ‘মৌ, জানতাম তোমার অভিমান ভাঙবে। আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না 

হাতের নখগুলো খুঁটিয়ে দেখছিএত পরিষ্কার করেও রেখেছো? আগে কখনও তো দেখিনি! আমি তোমার কাছে আসবো বলেই বুঝি?

তোমার বাইপাস সার্জারির সময় কেটে নেওয়া শিরার ক্ষতর ওপর আমার হাত স্তব্ধ হয়ে আছেঅনন্তকাল পড়ে থাকতে চায়ছে এখানেইপায়ের তালু এত পরিষ্কার ধবধব করছে! তোমার পায়ের নীচ সম্পর্কে এটা কখনও ভাবা যায়? সেখানে সারাক্ষণ লেপ্টে থাকে এই শহরের ধুলোকাদাশহরের বস্তি আর ফুটপাথের যাবতীয় নির্যাসএমনকি বন্যা কবলিত মালদা-মুর্শিদাবাদ, আমপান বিদ্ধস্ত সুন্দরবন, লকডাউনে কাজ হারানো মানুষের বাড়িঘরের ধুলোএসব তোমার পায়ের নীচে থাকবে না তা কি হয়?

আমার ঘরের বিছানায় উঠে বসার আগে বাথরুমে ভাল করে পা ধুয়ে এলেতারপরেও পায়ের নীচে ধুলোমাটির স্পর্শ পুরু হয়ে আছে যেন বা তোমার ত্বকেরই অংশ  

নিথর পা দুটো ঢেকে দিই সাদা কভার লাগানো কম্বলেছোট বোন ওকে চুমু খাওয়ার জন্য আমার অনুমতি চায়

কী যে বলিস! ওকে চুমু খাওয়ার আগে তোর অনুমতিই নেওয়া উচিত ছিল আমারআমার ছোট বোন হলেও তোমার কত আদরের সেই ছোটবেলা থেকে যখন সে প্রায় শিশু, মাকে ছেড়ে সদ্য এসেছে এই শহরে পড়াশোনা করতে তখন থেকেই তুমি ওকে আঁকড়ে থেকেছো, আমার থেকেও বেশি ওর সুখ দুঃখের সামিল হয়েছোওকে আমরা দুজনে নিজের সন্তানের মতো স্পর্শ করে থেকেছি সব সময়আমাদের নিজের সন্ততি না হওয়ার সিদ্ধান্ত সেই কবেই নিয়েছি, বিয়ের আগেইনিজের সন্ততি মানুষ যেভাবে ছুঁয়ে থাকে সেভাবেই বোন আমাদের দুজনের হয়ে উঠেছেও তোমাকে শেষ চুমু খাবে না তা কি হতে পারে? 

এই তো লকডাউনের ভেতর যখন বন্ধ সব যানবাহন আর ছোট বোন অসম্ভব ডিপ্রেশনে, পরিচিত অটো ভাড়া করে সেই কলকাতা উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় উড়ে এসে তুমিই ওকে জড়িয়ে নিলে বুকে। তারপর আগলে রাখলে সারাক্ষণ

এখন একটুও কাঁদছে না ছোট বোন, আমিওআইসিইউ এর ভেতর কাঁদতে নেইকান্নাহীন আদর আইসিইউ কর্মীরা বুঝি কখনও দেখেননিওঁরা ভীড় করে দেখছেন

ছোট বোন অ্যাটেনডেন্টকে পর্দাটা টেনে দিতে বলেনীল পোশাকের ছেলেটি টেনে দিতে থাকে সাদা পর্দার আড়াল যেন বা সে পর্দা দীর্ঘ হতে হতে আমাদের মাঝখানে এঁকে দেবে চির বিচ্ছেদ

তোমার দু চোখের পাতায় ঠোঁট স্পর্শ করছিতোমার বাঁ চোখ থেকে বেরিয়ে আসছে এক ফোঁটা জলচির বিচ্ছেদের বেদনা তুমি এভাবেই বুঝি জমিয়ে রেখেছিলেআমি যত্নে মুছিয়ে দিলাম সেই অশ্রু 

বেদনা রেখ না প্লিজআমাদের আস্তিনে জমানো কত সূর্যকরোজ্জল দিনসেসব মনে করে কাটিয়ে দেওয়া যায় এক জীবন। কিন্তু যারা বেঁচে থাকে তারা কি পারবে, বেদনাহীন বেঁচে থাকতে? না, পারছি না। দু বছর পরেও কান্নাগুলো বুক ঠেলে উপচে আসছে ক্ষণে ক্ষণে।

জানি, আমার অনুরোধ শুনতে পাচ্ছ না, স্পর্শ করতে পারছো না অনুভবতোমার শরীর এখন শুধুই দৃশ্যসেই দৃশ্য আঁকড়ে ধরছি যা কিছুক্ষণ পরে চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে 

তোমার বাঁ চোখ থেকে নেমে আসা এক ফোঁটা অশ্রু ছুঁয়ে তোমাকে আদর করছিএই প্রথম বারের মতো সে আদর বুমেরাং হয়ে ফিরছে আমার কাছেই

তোমার মৃত্যুর পর এই রুক্ষ শহরের আনাচে কানাচে লাল হয়ে ফুটে আছে শিমূল, পলাশ, কোথাও কোথাও থোকা থোকা অশোক। কি নিষ্ঠুর মনে হতে থাকে প্রকৃতিকে! জানি, প্রকৃতির কাছে এই মৃত্যু খুব সামান্য ঘটনা, আবহমান  জুড়ে ঘটে যাওয়া তুচ্ছ এক বাস্তব। তাকে ফিরতেই হবে জীবনের স্রোতে। জানি, তথাগতর কাছে এক মুঠো শস্য আমি নিয়ে যেতে পারবো না, তোমাকে বাঁচিয়ে তোলার আশায়, কেননা সেই শস্যদানা হতে হবে যে বাড়িতে কেউ কোনদিন মারা যায়নি, সে বাড়ির। তেমন বাড়ি কোথায় পাবো, তথাগত?  

আবার ফিরে যাই শায়িত তোমার মুখোমুখি। তোমার নিথর মুখ জুড়ে আমার আঙুল ঘোরাফেরা করে। এই মুখ, আর কোনোদিন, কোনদিন ফিরবে না, রক্ত মাংসের হয়ে।

বাষ্পে ভেজা চোখ, নিয়ন্ত্রণ করি, প্রাণপণে।  

-----------------------------------------------------

 ছবি: লেখক 


**লেখক রাজা বিশ্বাসের স্ত্রী। আজ তার মৃত্যুর দ্বিতীয় বছর।  

  

 

 

 

Saturday, 6 August 2022

এলাচ গন্ধ

 




                                                 এলাচ গন্ধ

মৌসুমী বিলকিস


কী বিশাল বাগান! এক ধার থেকে আর এক ধার হেঁটে যাওয়া যায় না।

নাম না-জানা মোটা মোটা বড় বড় গাছ আর ছায়া।

 

আমি মুর্শিদাবাদের। কেরলের এলাচ বাগানে কাজ করি। আমরা পাই সাড়ে ছ'শো। মেয়েরা সাড়ে চারশো।

 

কেন?

 

মেয়েরা কি এলাচের ভারি ভারি বোঝা মাথায় নিতে পারে নাকি? তাই মায়নেও কম। 

 

এলাচ গাছ হলুদ গাছের মতো। ওইরকম চ্যাপটা লম্বা পাতা। ঝোপ ঝোপ। এ্এট-কটা ঝোপে আট-দশটা গাছ। বড় গাছের ছায়ায় লাগানো।

 

আমরা এলাচ গাছের গোড়ায় আগাছা হতে দিই না। পরিস্কার করি নিয়মিত।

 

গাছের গোড়ার দিকে ডাটি বেরোয়। এলাচ ধরে।

 

এলাচ গাছের গন্ধে ম-ম বাগান। এলাচ তুলতে তুলতে সারা শরীরে গন্ধ। মা বলে আমি এলাচ হয়ে গেছি।

 

গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে স্পষ্ট দেখতে পাই, মা গোস্ত রাঁধবে বলে মশলা বাটছে। মার শরীর দুলছে তালে তালে।

এলাচ থেতো হচ্ছে শীল-নোড়ায়।

 

ইদের গোস্ত খেতে ফিরব মা। তোমার জন্য কিনব ইদের শাড়ি।

--------------------------------------------------------------------------

                                                    প্রকাশিত: রবিবাসর, আজকাল, ১৫ জুলাই, ২০১৮ 

Saturday, 16 July 2022

সবুজ চোখেরা

 

 

সবুজ চোখেরা

মৌসুমী বিলকিস



 

এক চিলতে সূর্যরশ্মি নিয়ে খেলা করছে নূর। নূরজাহান মানে নূর দেখে কীভাবে যেন আলোর ফালিটা জানলা ভেদ করে এসে পড়ছে বিছানায়, একেবারে হাতের মুঠোয়। আলোর পথ ধরে তালু সঞ্চালন করে নূর, একবার ওপরে, আবার নীচে আলোর বৃত্ত তালুতে পড়ে থাকে চুপচাপ

আলোর কি চেতনা আছে? যা স্পর্শ করে তারই বোধ জমা হয়ে থাকে আলোর মজ্জায়? তাহলে এ পৃথিবীর সবই জানে আলো। নিজেই ভাবে, নিজেই আশ্চর্য বোধ করে নূর। কিছুক্ষণ মগ্ন হয়ে দেখে আলোর ফালি। প্রায় অদৃশ্য অসংখ্য কণা উড়ে বেড়াচ্ছে আলোর শরীরে। এ কণারা কি আলোর নিজস্ব? নাকি আমাদেরই ঘাম, রক্ত, ধুলো?   

  

‘এই আলো... আলো

 উত্তর নেই  

‘আমাকে খাবার দেবে?’

আলোর বৃত্তটা সামান্য নড়ে ওঠে।

‘তুমি গাছেদের দাও। আমাকে দেবে না?’

স্থির তালুর ওপর ছোট্ট বৃত্তটা স্পট লাইটের মতো ঘোরাফেরা করে। তালুতে অদ্ভুদ এক স্পর্শের বোধ। যেন ঘটনাটা খুব স্বাভাবিক, এমনভাবেই বৃত্তের চলন দেখে নূর। তার স্থির চোখের মণিতে আলোর বৃত্তটা ঘোরেস্তব্ধ হয়ে সে দেখে। সমস্ত চিন্তা থেকে কিছুক্ষণের মুক্তি কিন্তু আলোটা স্থির হতেই চিন্তা ঘিরে ধরে। শব্দ করে শ্বাস নেয় নূর যে শ্বাসে ভর করে কিছু দুশ্চিন্তা উন্মুক্ত হয় বাতাসে 

‘জানো আলো, কাজ গেছে। ছাঁটাই। নিজের কথাই বেশি ভাবে লোকে। আমিও এই লকডাউনে চুপচাপ ঘরে বসে’, একটু থামে নূর ‘জীবনের সব রসদ শেষ হয়ে এল

আলোর বৃত্ত নিশ্চুপ।

‘বল প্লিজ, আমার খাবার বানিয়ে দেবে?’

আলোর বৃত্ত আবার ধীরে ধীরে নড়ে। ডান হাতের পাতা জুড়ে ঘুরতে থাকে। কিছুক্ষণ স্থির রেখে হাতটা সরিয়ে নিতেই বৃত্তটা কোলের ওপর এসে পড়ে। দু পায়ের সংযোগ স্থলের ওপর ঘোরে বৃত্তআনমনা হয়ে দেখে নূর। সময় যেন থমকে থাকে বৃত্তটার ভেতর। এক সময় রশ্মির পথ ধরে বৃত্তটা হারিয়ে যায় আর বিছানায় শুয়ে পড়ে নূর

 

         চোখ বন্ধ করতেই অসংখ্য চাকচিক্যহীন পা পিচ রাস্তায় হাঁটে ধপ ধপ শব্দ করে লুটিয়ে পড়ে ক্লান্ত মানুষেরা। ছোটে ট্রেন। রেললাইনে রক্তাক্ত রুটি। কালশীটেময় রক্তের একটা দেয়ালের মধ্যে ঢুকে পড়ে নূরনিজের শরীরের সমস্ত রক্তই যেন ছিটকে ছিটকে পড়ছে রাজপথেবন্ধ চোখের ওপর উড়ছে রক্তের এক পর্দাঅস্বস্তিকর অবস্থাটা কাটাতে উঠে বসে নূর। টেনে নেয় ‘বেলা অবেলা কালবেলা’। পাতা ওল্টায়। 

‘ইতিহাস খুঁড়লেই রাশি রাশি দুঃখের খনি

ভেদ করে শোনা যায় শুশ্রূষার মতো শত-শত

শত জলঝর্ণার ধ্বনি।’

 

নূরের হৃদয় পর্যন্ত কিছুতেই পৌঁছচ্ছে না সেই ধ্বনি। তবে কি শুনতে না পাওয়ার কৃতিত্বহীনতা তারই? খোলা বইয়ের পাতা। গুম হয়ে বসে থাকে সে। মাথার ভেতর ছেঁড়া ছেঁড়া কতকিছু যাতায়াত করে। শুশ্রূষার ধ্বনি খুঁজে নিতে হবে। কোথায়, কীভাবে জানে না। জানে না আদৌ ধ্বনির উৎস ছুঁতে পারবে কিনা।

 

‘আমি কি পাগল হয়ে যাবো?’, এই জিজ্ঞাসা তাকে কাতর করে তোলে।  

‘উফ!’, ভেতর থেকে কিছু উষ্ণ বাতাস উগরে স্বস্তি খোঁজে।

জানলার ওপার অলৌকিক রোদে ভাসছে। এই তপ্ত দুপুরে, এই ঘামে নিষিক্ত শরীর দাঁড়াবে কি রোদের মায়ায়? সেঁকে নেবে জলজ অন্তর? নিংড়ে শুকোতে দেবে স্যাঁতসেঁতে নাছোড় ভাবনা?

 

‘আমি পাগল হয়ে যাবো!’

নিশ্চিত হয় সে আর টের পায় বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা। ব্যথার অন্তরে কোনও তরলের অবিরল ক্ষরণ কুলকুল শব্দ করেতীব্র আগুন। ঝলমলে শিখার ভেতর হেঁটে যেতে যেতে নিজের রক্ত-মাংসের গলে পড়া শোনে। সহসা সে অনুভব করে হাড়ে হাড়ে প্রবল কম্পন। আশীরনখ কাঁপতে কাঁপতে সাদা পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে বরফাচ্ছন্ন সীমাহীন উপত্যকার দিকে। বরফে ঢাকা স্ফটিকের মতো সরলবর্গীয় গাছ এক ঝলক দেখতে পায় কেননা কষ্ট করে চোখের পাতা এক মুহূর্ত মেলতে পারে আর গাছটির নীচে এসে সে স্থির হয়। অবশ পড়ে থাকে। বৃষ্টির শব্দ মেখে আকাশ থেকে নেমে আসা বরফের কুচি এই উপত্যকার সবকিছুর মতো ক্রমে ক্রমে ঢেকে দেয় তাকে। এক শীতল কবর জুড়ে হিম আচ্ছন্নতা 

 

কখন সকাল হয়, কখন রাতভর খোলা জানলা জুড়ে ফিনফিনে পর্দা ওড়ে, কখন একাকী চড়ুই এসে বসে দুলন্ত তারে, কখন বাতাস ঢেউ তোলে পতিত জমির আগাছার পাতায় পাতায় আর কখন আলোর ধাক্কায় জাগে নূর- জানে না সে। কিন্তু চেতনার গভীর প্রদেশে অস্ফুটে ঝুলে থাকে এইসব বিবিধ তুচ্ছতা একটি ভোরের দৈনন্দিন শব্দাবলী কানের ভেতর শুষে নিতে নিতে খুব ধীরে চোখের পাতা খোলে নূর। তখনই সে অনুভব করে অন্তর্গত খিদের মোচড়। ছোট্ট রেন্টাল ফ্ল্যাটের যাবতীয় দেয়াল মৃদু দুলে ওঠে। নিজেকে সে নিঃসঙ্গ বিছানা থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় বাথরুমে আর হাতের পাতায় জল ভরে চোখেমুখে বোলাতে বোলাতে চোখ যায় ডান হাতের পাতায়। হালকা সবুজ আভা। ট্যাপের নীচে হাতের পাতা রেখে ভাল করে ধুয়ে আবার সে দেখে। রং লেগে থাকেসাবানের ফেনা ঘঁষে আবার দেখে হাত।   

‘যাচ্ছে না কেন!’

ক্ষীণ ভাবনা নিয়ে প্রাতঃকৃত্য শেষ করে রান্নাঘরে যায়। খাবারের সমস্ত বয়াম হাতড়ে পায় কিছু গমের আটা। আর্তনাদ করে মেঝেতে ভেঙে পড়ে সুদৃশ্য সেরামিক বাটি। ভেঙে যাওয়া টুকরো কুড়িয়ে রান্নাঘরের তাকে তাকে সাজানো দৃশ্যত সুন্দর শূন্য কাচের বয়ামগুলোর দিকে নিঃস্পৃহ চেয়ে থাকে। ছোট্ট গ্লাস পটে এখনও কিছু নুন অবশিষ্টশৈশবের গ্রাম্য স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ে যায় রেসিপি। কোনও খাবার না জুটলে চারটি আটা ধার করে এনে মা বানিয়ে দিতেন।

নুনজলে অল্প আটা নিয়ে সে বানিয়ে নেয় আটার মণ্ড। দু হাতের পাতায় মণ্ড ঘষে ঘষে নানান আকার দিতে থাকে। তারামাছ, লম্বাটে সুতলি, সুতলিগুলো কখনও চ্যাপ্টা করে দেয়, বানায় ছোট্ট বাতাসা মনে পড়ে এর নাম, ‘এখে’। মণ্ডে আকার দিতে দিতে হাতের পাতার সবুজ ভাবটা আবার চোখে পড়ে। আটার মণ্ডে রং লাগছে না। তাহলে ত্বকেই হয়েছে কিছু।

রান্নার গ্যাস এখনও শেষ হয়নি। ভাগ্যিস! নুনজল ফুটে উঠলে তার ভেতর ফেলে দেয় এখে। বাকি আটা জলে গুলে বানায় তরল আটা। কিছুক্ষণ এখে ফুটিয়ে তরল আটা ঢেলে দেয় ফুটন্ত জলে। সব মনে পড়ে যায়। শুধু তরল আটা নুনজলে ফোটালে এর নাম হত ‘দলে’ তবে এখন এই পদটির নাম হল ‘এখে দিয়ে দলে’। অনেকটা জল আর সামান্য আটায় এভাবেই ক্ষিদে মেটাতো শিশু নূর এবং গ্রামের অনেকেই আরও কতরকম যে ছিল গরীবের খাবার। এখনও নিশ্চয় অনেক প্রান্তবাসীরা এইসব খায়। নূর ভুলেই গিয়েছিল এর স্বাদ, এর যন্ত্রণা, এ স্বাদের দ্রোহ। লকডাউন ফিরিয়ে দিল সেই অনুভব, প্রান্তবাসীর যন্ত্রণা

 

    বাটিতে করে সুপের মতো ‘এখে দিয়ে দলে’ খেতে খেতে অসুস্থ বোধ করে নূর। করোনা হয়ে গেল নাকি? কপালে তালুর উল্টোদিক স্পর্শ করে উত্তাপ নেয়। নেই। তবুও ভয় ও দুশ্চিন্তা ছেঁকে ধরে। যতটা না করোনার জন্য তার থেকে বেশি রোজগারের সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে। মা-বাবাকে টাকা পাঠানো বন্ধ হলে চলবে না। যেটুকু জমানো আছে সেখান থেকেই মাসে মাসে পাঠাতে হবে। ভাইবোনের হঠাৎ প্রয়োজনের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। বাড়িভাড়া, ইলেকট্রিক বিল, মোবাইলের খরচ কিছুই কমবে না। বাড়িওয়ালাকে বলেও ভাড়া কমানো যায়নি। বাকি দুটো সংগঠিত কোম্পানি। ওদের খরচ কমাতে বলার কোনও রাস্তাই খোলা নেই। ওদের কান অব্দি পৌঁছালেও মন অব্দি পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। ফলে খাওয়া খরচে কোপ ফেলা ছাড়া উপায় নেই। চাকরি যাওয়ার পর নিজের মাসিক খরচ এক তৃতীয়াংশ করে ফেলেছে। মাসে এর থেকে এক টাকাও বেশি খরচ করবে না। একমাত্র উপায়, না খেয়ে থাকা।   

বন্ধুবান্ধবদের জানালে সাহায্য করবে না? নিশ্চয় করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে কার অবস্থা কেমন জানে না। যারা মোটা মায়নে পায় তাদের খরচও বেশি। হয়তো ইএমআই দেয় অনেককিছুর। ওদের মায়নেও কমেছে। তাদের কাছে হাত পাতা যাবে না। লকডাউন পীড়িত মানুষের জন্য অনেকে লঙ্গরখানা খুলেছে। শেষে কি সেখানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে? লজ্জায় কুঁকড়ে যায় নূর।

 

‘Neo poor! নব্য দরিদ্র। সব ছিল। কিন্তু ফুউউস... এখন নেই।’, ভাবে নূর।  

আলোর ফালিটা আবার এসেছে। বৃত্তটা হাতে নিয়ে খেলা করতে করতে আলোর সঙ্গে কথা বলে নূর। আলোর বৃত্তটা হাতের পাতায় তুলে চুলের ভেতর মেখে নেয়, স্পর্শ করে চোখের পাতায়। একবার এ হাতে একবার ওহাতে। ছোট্ট একটা আলোর বল গড়িয়ে গড়িয়ে যেতে থাকে এহাত ওহাত।

 

‘কিন্তু দেখ, কেউ বিশ্বাসই করবে না দরিদ্র বলে। জামাকাপড়, জুতো, মেকআপ কিট সব ব্র্যান্ডেড। নামি ব্র্যান্ড। অর্থ জমিয়ে এক এক করে কিনেছিলাম।’, এহাত থেকে ওহাতে আলো ঢালতে ঢালতে বলে নূর।

 

‘মাঝে মাঝে পার্লারে গিয়ে চুল ও ত্বকে মাঞ্জা দিতাম। সাজতে ভালই লাগে। সুন্দরী মনে হয়। যদিও ছোটবেলা থেকে কেউ আমাকে সুন্দরী বলেনি। বরং আমি কত কুৎসিত সেটাই শুনেছি। বহুজাতিক কোম্পানিতে সামান্য চাকুরে হিসেবে কাজ করলেও এসব দরকার হয়। উচ্চাশাও বাড়ে। তবে অন্যের ক্ষতি করে উচ্চাশা করিনি।’

চুলের গুচ্ছ আলোর ভেতর ডুবিয়ে দেয় নূর।

 

‘যদিও অনেকবার ভেবেও ফ্ল্যাট কেনার সাহস করিনি। অত ইএমআই দিতে গেলে বাড়িতে পাঠানোর টাকায় টান পড়তো। অসন্তুষ্ট হত সবাই। সিদ্ধান্তগুলোও কেমন ভীরু। পিছনে টেনে রাখে। তাই না?’

হাতের পাতায় টলমলে আলোর ভেতর ঠোঁট ছোঁয়ায়, যেন চুমু খায়।

 

‘আর বিয়ে। এই প্রতিষ্ঠানে নাম লেখাতে চাইনি। বান্ধবীদের দশা দেখে। মা-বাবা ছোটবেলায় বিয়ে দিলে কতগুলো সন্তানের মা হতাম বলা মুশকিল। জীবন খুঁড়ে এভাবে দেখা হত না, আমি নিশ্চিত।’     

আলোটা ঘুরে ঘুরে সারা দেহে আদর বুলায়। অসুস্থ ভাব সহসা কেটে যেতে থাকে। নিহিত শূন্যতায় চঞ্চলতার বোধ। রশ্মির পথ ধরে ফিরে যায় আলো।

 

‘কোন ছায়াপথ থেকে আসো তুমি আলো? নাকি তুমি নেবুলার স্মৃতি?’

 ভাবতে ভাবতে স্নানঘরে ঢুকে যায় নূর। শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক অনুভব বিষাদ টপকে উপচে পড়তে থাকে। শ্বাস প্রশ্বাস জুড়ে নরম রোদের সুবাস। শাওয়ার নিঃসৃত জলে নিহিত পাতাল স্পর্শ। শরীরময় দূরের হাতছানি। হাতের দুই তালু ঘন সবুজ। স্নানঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে নূর। ভিজছে মেঝের মার্বেল। নগ্ন দাঁড়ায় আয়নার বুকে। সবুজ চুল, যোনি কেশ, বাহুমূল। আচমকা এক ভয় হানা দেয়।

 

‘আমি কি পাগল হয়ে গেছি? ত্বকে কী হয়েছে আমার?’

কিছুক্ষণ আগের সতেজ ভাব কেটে যায়। অসুস্থ মানুষের মতো ত্বক, চুল, তালু ঘঁষে ঘঁষে রং সরানোর চেষ্টা করে। রং থাকে আগের মতোই। চরম বিদ্ধস্ত মনে ক্রমশঃ সে টের পায় ভেঙে চুরে যাচ্ছে অন্তর। অশান্ত এক কষ্ট এই ঘন রঙের মতোই চেপে বসে যেতে থাকে। কষ্টের ভেতর ডুবে যেতে যেতে অজানা কোথাও হেঁটে যাওয়ার তীব্র তাগিদ অনুভব করে সে। সময় এগোয়। গভীর  তাগিদে বাইরে যাওয়ার দরজা খুলে বের হয় নূর। দাঁড়ায় নির্জন পথে। কোথাও যেন এক্ষুনি পৌঁছতে হবে। সামনে পা বাড়ায়।

পায়ের স্পর্শে স্পর্শে জন্ম নেয় পথ। আদিম ধুলোয় পা ডুবিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে নিরস্ত করার কোনও ইচ্ছেই জাগে না। কোনও এক ঘন নাছোড় রসায়ন তাকে টেনে নিয়ে চলে। রাস্তা তাকে নাকি সে-ই রাস্তাকে নিয়ে যায় প্রশ্ন সাপেক্ষ। অন্তর্গত তীব্র তাগিদ এনে ফেলে এক সমতলে যেখানে সে দেখে সেইসব চাকচিক্যহীন পা। দেখে তারই মতো সবুজ মানুষ। দেখে তাদের সমস্ত চুল নানান পাতার আকার নিয়েছে। দেখে বোধি প্রাপ্ত সবুজ চোখ। মানুষ গাছেরা হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানায়। ছুঁড়ে দেয় বন্ধুত্বের রসায়ন। কেউ কারও অপর নয়, যেন কত যুগের যৌথ যাপনে অভ্যস্ত এই মানুষেরা।

 

     দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাসও। তারার আলোয়, চাঁদের সান্নিধ্যে, হাওয়ার ঘ্রাণে, শেকড়ে জলের শব্দে নূরের অন্তরের সবুজ পাতাগুলি কুঁড়ির মতো ফুটে উঠতে থাকে। পাতাগুলি বড় হয় আর বসন্ত আসে অথবা আসে না।  অন্তঃস্থল থেকে জেগে ওঠে ফুলের গুচ্ছ।  

দাস হয়ে থাকার কাল তারা পেরিয়ে এসেছে। এই মানুষ-বনভূমির সবার মতোই খাদ্যের বিষয়ে এখন স্বনির্ভর নূর।   

------------------------------------------    

 

 

          

Wednesday, 2 February 2022

আমাদের স্মৃতি সত্তা

 

 

 আমাদের স্মৃতি সত্তা

মৌসুমী বিলকিস


[আমার বরই শুধু নন তিনি, সব থেকে কাছের বন্ধু এবং কখনও  কখনও  সহকর্মীও। আমরা ভাগাভাগি করেছি যাবতীয় ভাললাগা, রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, বর্বরতা এবং আদরও । ভুল হলে ক্ষমাও করেছি পরস্পরকে। তাঁর মৃত্যুর পর এই প্রথম ঘর ছেড়ে বেরোনো, সেই তাজপুরে যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের শেষতম যৌথ ভ্রমণ। এই লেখা তাই উৎসর্গ করছি তোমাকে, রাজা বিশ্বাস (২৮ ডিসে, ১৯৭৪ - ৩০ নভে, ২০২০)]

 

এই সেই তাজপুর, মৃদু হাওয়া আর রোদে ভিজে থাকা তাজপুর, আমাদের চোখের সামনে কেমন পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে। এই সেই সমুদ্র, তারযন্ত্রের শৃঙ্খলাবদ্ধ শব্দের মতো ঢেউগুলো ক্রমাগত ছুঁয়ে যাচ্ছে তটরেখা আর দুঃসাহসী জেলে নৌকাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে দূরে।

আমরা এসেছিলাম, কতবার যে! এই নোনা জল মেখে, এই হাওয়া ও রোদ জড়িয়ে আমরা হেঁটেছিলাম খাঁড়ির দিকে আর দেখেছিলাম ওপারে মন্দারমনির ধোঁয়াটে আবছায়া ক্যাজুরিনা, কুড়িয়েছিলাম ভীষণ অপ্রত্যাশিত ছোট ছোট তিনটে কড়ি, ভেজা বালির ভেতর মুখ গুঁজে পড়ে থাকা তিনটে কড়ি, গভীর সমুদ্রের গান বয়ে এনেছিল আমাদের কাছে। ওদের দেখতে দেখতে আমার ডান হাতের তালুর ভেতর বিস্ময়ে ঝুঁকে পড়েছিলে তুমি, কেননা এই তটরেখায় কড়ি আমরা আগে পাইনি কখনও।        

আমি যখন একটু দূরে বালির ভেতর ছোট ছোট গর্ত থেকে উঠে আসা রোদ পোহানো, দুই অ্যান্টেনা খাড়া লাল কাঁকড়াদের দেখছিলাম এটা জেনেই যে কাছে গেলেই সুড়ুত করে ঢুকে যাবে গর্তে, ঠিক তখনই তুমি কুড়িয়ে নিয়েছিলে বালির ওপর পড়ে থাকা সাদা একটা পালক, বকেরই হবে বুঝি; উপহার দিয়েছিলে আমাকে আর আমি খুশিতে ডগমগ। এই নিয়ে তোমার দেওয়া কয়েকটা পালক জমলো। সেই যে ছোট্ট পালকটা, বলেছিলে প্যাঁচার; মনে আছে?

ও! না! তুমি চেতন ও অবচেতন রেখা ছাড়িয়ে চলে গেছ, চিরদিনের জন্য। অথচ এখনও আমার স্পর্শের ভেতর, আমার কথার সন্নিকটে, আমারই চেতনায়, আমারই শ্বাসের স্পর্শে, আমারই বেদনায়, তুমি। 

আরেক বার এনেছিলে বেশ বড়সড় একটা পালক, ঈগল জাতীয় কারও হবে বুঝি। বন্ধুর সঙ্গে যতবার পাখি দেখতে গেছ ততবার আমার ছিল একটাই আব্দার, ‘পালক চাই কিন্তু।’ আর প্রায় প্রত্যেকটি পাখি-ট্রিপ থেকে ফিরে প্রেমিকাকে হীরের নেকলেস দেওয়ার ভঙ্গিতে প্রেমে গদগদ হয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছো পালক আর হীরের দ্যুতিই যেন ছড়িয়ে পড়েছে আমার চোখে। অনেক ঝড়জল, ধুলোবালি পেরিয়ে এখনও সেইসব পালক রেখেছি যত্নে বা অযত্নে – এসব তুমি জানতে।

প্রেমিক হিসেবে জুড়ি নেই তোমার, কত বার বলেছি, আবারও।    

সব মনে পড়ে যাচ্ছে, এই তাজপুরের তটরেখায় পা ডুবিয়ে হাঁটতে হাঁটতে থমকে যাচ্ছি স্মৃতির ভেতর।   

আমাদের যৌথ স্নান, তুমি-আমি-বন্ধু-বান্ধবী ও বোনেরা; কত বার কত যৌথ স্নান এই তাজপুরে, মজা করে বালি মাখামাখি, নোনা জল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভেজা পরস্পরকে আবার ভেজানো, খুনসুটি।

সব মনে পড়ে যাচ্ছে। সব বুঁদ হয়ে আছে নিহিত বেদনার অন্দরে, সব স্নান, সব অবগাহন, সব হাঁটাহাঁটি, স…ব, সবকিছু।

এবার আর জল ছুঁতে পারিনি তাই। এইসব স্মৃতি, এইসব বিষণ্ণতা, এইসব জলজ মুহূর্ত বুকে নিয়ে এতদিন পর ঘরের কোণ থেকে, কলকাতা থেকে জোর করে বেরিয়ে পড়লাম, আমাদের শেষতম ভ্রমণ বিলাস ছুঁয়ে দেখবো বলে। অথচ এই তাজপুরে আজ একাকী হাঁটতে হাঁটতে চোখ ভিজে যাচ্ছে বার বার। এইসব লিখতে বসেও ঝাপসা হয়ে আসছে অক্ষর। জানো?

ও! তুমি আর কখনও কিছুই জানতে পারবে না। 

তোমার আর মনে পড়ার কথাই না যে আমরা কতবার ছিলাম এই ‘নেচার ক্যাম্প’-এ যেখানে আমি আছি, ওদের সুস্বাদু খাবার খেতে খেতে কত গল্পই যে করেছিলাম আর আমাদের একান্ত গোপন স্পর্শে জেগে উঠেছিল বিছানার চাদর, জেগে উঠেছিল মধ্যরাত।

তোমার মনে পড়ার কথাই না যে আমরা প্রথম যখন তাজপুর আসি ‘নেচার ক্যাম্প’-এ ছিল কি সুন্দর কয়েকটা তাবু। আশপাশ একেবারে ফাঁকা তখন, এত গায়ে গায়ে যাত্রীনিবাস হতে যাচ্ছে প্রথম বার কল্পনাই করতে পারিনি আমরা। আর ঠিক সামনের মেঠো রাস্তার দু’ধারে কেয়া গাছের জঙ্গল যেন সজীব সবুজ দেয়াল আর সেই রাস্তা সোজা গিয়ে পড়েছে সমুদ্রে আর গ্রামের লোকেরা গরু চরাতে যেত এবং সূর্য ডুবলে ধুলো উড়িয়ে গরু নিয়ে ফিরে আসতো যে রাস্তায়, যে রাস্তা দিয়ে সমুদ্রের কাছাকাছি গেলে- কি নির্জন! শুধু তুমি আর আমি। অনেক দূরে, অনেকটা দূরে হয়তো দু একজন স্নান করছে আর কচ্চিৎ বিচ ধরে সাইকেল চালিয়ে আসছে স্থানীয় কেউ, কোনও জেলে হয়তো ঠিক তখনই নৌকা ভেড়ালো মাছ ধরা শেষ করে।

সেই কেয়া জঙ্গল নেই আর, সেই রাস্তা এখন ঝকঝকে পিচের, সেই নির্জন সমুদ্র তট এখন কংক্রিটের জঙ্গলে ভরে গেছে, ভ্রমণ পিপাসুর সুবিধার জন্য নানান স্ট্রাকচার।

‘নেচার ক্যাম্প’-এর তাবুতে রাত যাপন, তুমি কিছুক্ষণের জন্য তাবুর বাইরে, আমি ব্যাগ থেকে বের করেছি গোপনে নিয়ে আসা গোলাপ পাপড়ি, পাপড়িতে ভরিয়ে দিয়েছি সাদা চাদর আর তুমি তাবুতে ঢুকে একেবারে চমকে গেছ, চোখ বড়বড় করে গদগদ ভঙ্গিতে হাসছো। এত শীত! আর আমাদের এত উষ্ণতার পরেও পাপড়িগুলো শীতে জমে এত শীতল হয়ে যেতে পারে! এ কথা আমরা জেনেছিলাম মধ্যরাত পেরিয়ে যখন টের পেলাম পাপড়িগুলোর শীতল স্পর্শ। তাবুতে সেদিন রাত না কাটালে, গোলাপের পাপড়ি সঙ্গে না নিলে গোলাপ-পাপড়ি বিষয়ক এই অনুভূতি আমরা জানতেই পারতাম না কখনও। না জানলেও যে ক্ষতি হত তেমন নয়, কিন্তু খুব আনন্দ পেয়েছিলাম আর ভাগ করে নিয়েছিলাম দুজনে। 

আর এবারই প্রথম জানতে পারলাম সেইসব তাবু আয়লায় উড়ে যায় আর তাবুর আশেপাশের গাছপালারও ক্ষতি হয়। ফলে তাবুর ভাবনা ছেড়ে দিয়ে নতুন ঘর বানাতে হয়। কিন্তু শেষ বার তুমিআমি যে ঘরে ছিলাম সেটা আছে এখনও। না, ওই ঘরে আমি থাকিনি এবার। ওই ঘরের দিকে তাকালেই কত স্মৃতি ভিড় করে আসছে যে। সামনের গাছগুলোয় টাঙানো দোলনা, তুমি একটু টেনে ধরে দুলিয়ে দিয়েছিলে, সেই গাছগুলো আম্ফানে পড়ে গেছে, দোলনাটা নেই।

এক অপ্রাকৃত অনুভূতি নিয়ে বিচ থেকে ফিরে ‘নেচার ক্যাম্প’-এর ডাইনিং রুমটায় রাতের খাবার খেতে খেতে আমরা কত আড্ডা দিয়েছি, অনেক রাত পর্যন্ত। যে যা খেতে চেয়েছি ওদের রান্নাঘর থেকে ঠিক সময়ে পৌঁছে গেছে টেবিলে। শেষতম ভ্রমণে ইরমট্রডের আনা চেক রিপাবলিকের মধু-কেক ভাগ করে খেয়েছি সবাই। 

সেই ডাইনিং রুমে খাচ্ছি, আর বার বার ফিরে আসছো তুমি, আমার চেতন জগতের কোলাহলেও।    

আমরা বসেছি কত বার বিচের দোকানগুলোর লাল চেয়ার-টেবিলে, দুপুরের হাওয়া ঘিরে ধরেছে আমাদের, আর আমরা যারা ডাবের জল মেশানো পানীয় ভালবাসি তাদের হাতে হাতে ধরিয়ে দিয়েছো গ্লাস, ভাজাভুজি আর ডাবের শ্বাস, কেউ কেউ পানীয় শেষ করে নেমে গেছে জলে, কেউ কেউ টেবিল ঘিরে গল্পে মশগুল, আর এসবের একটা নিকনেম দিয়েছিলে, বন্ধুরা জানে, ‘লাইট করে’, আমাদের পানীয় বিলাসের নামই হয়ে উঠেছিল তাই ‘লাইট করে’, তোমার কল্যাণেই, যেভাবে বন্ধুদের বা কোনও বিষয়ের ঠিক একটা নিকনেম দিয়ে দিতে তুমি, আর সেসব হত মজার এবং কখনও কখনও ‘অশ্লীল’ও।

সেই দোকানগুলোর একটায় এখন চা খেতে খেতে সেইসব মনে পড়ছে খুব।  

সমুদ্রতটে যতদূর নোনা জল আসে সেটুকু ছাড়িয়ে আমরা দেখেছিলাম সারি সারি কেয়ার ঝাড়, তার পাশেই ক্যাজুরিনা জঙ্গল, জঙ্গলে নানান বুনো গাছ। এবার কেয়া গাছ দেখলাম দু’একটা জানো! কিন্তু সব পাতা শুকনো, শুধু দু’একটি সবুজ; আর আম্ফান এবং ইয়াস-এর দাপটে ওল্টানো কিছু শুকনো ঝাউগাছ এখনও পড়ে আছে কোথাও কোথাও, ঝাউগাছের শুকনো ডাল জড়ো করে মাথায় বয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় মেয়েরা, একেকটা বোঝা কত ভারি হবে বল তো? মনে হচ্ছে কুড়ি বা তিরিশ কেজির মাঝামাঝি।

আমি নিশ্চিত এত ভারি তুমি বইতে পারতে না, আমিও না। জেন্ডারের দোহাই দিও না প্লিজ, সবটাই অভ্যেস। এই স্থানীয় মেয়েরা আমাদের কলকাত্তাইয়া বাবু পুরুষদের তুলনায় অনেক অনেক গুণ খাটতে পারার ক্ষমতা রাখে। হুঁ হুঁ বাবা, একদম তক্ক করবে না। পুরুলিয়াতেও কত মেয়েদের ভারি কাঠের বোঝা বইতে দেখেছি তুমিআমি আর শিয়ালদার কোলে মার্কেটেও। ফলে জেন্ডার স্পেসিফিক কাজকর্ম খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার স্যাপার, আর এ বিষয়ে কত কথা কত বার বলে ফেলেছি আমরা আর তাতেই যে কথাবার্তা মিটে গেছে তেমনটাও নয়। কিন্তু তোমার সঙ্গে সব কথা যে একপাক্ষিক হয়ে দাঁড়ালো! এটা কি অসহনীয় নয়, বলো? 

অসহ্য! 

তুমি! 

অসহ্য এখন এই সূর্যাস্তের আলো!

সমুদ্র আর ভেজা বিচের ওপর উপচে পড়েছিল রং আর সেই রঙের ভেতর দিয়ে হেঁটেছিলাম আমরা, হাত ধরাধরি করে নয়, একটু তফাতে, আর ভেজা বিচের ওপর জেগেছিল আমাদের প্রতিবিম্ব এবং অন্যদেরও, জাল কাঁধে মাছ ভর্তি ব্যাগ হাতে ফেরা জেলে-মাঝিভাইদেরও শীতে কাঁপা প্রতিবিম্ব দেখেছিলাম আমরা; যদিও গোধূলি আমাদেরও দিয়েছিল লালচে আভা, আর আমরা তা বয়ে এনেছিলাম কলকাতা পর্যন্ত আমাদের দৈনন্দিন মলিনতায়, আর কতদিন, কত কত দিন আমাদের ভেতর পর্যন্ত আলোকিত হয়ে সুপ্ত পুলক হয়ে জেগেছিল তা। আজ সব মনে করতে পারি।

মনে পড়ছে, আবছা অন্ধকারের ভেতর আমরা হেঁটেছিলাম সমুদ্রের পাড় ধরে, আর শুনেছিলাম অবিরাম ঢেউ, আর তখনও বিচের দোকানগুলো খোলা, আর আকাশ ফুঁড়ে জ্বলজ্বল করছে কিছু কিছু তারা এবং চাঁদও ভেঙে পড়ছে সমুদ্রের জলে, আর সহনীয় বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে বসনপ্রান্ত, মুক্ত চুলের গাছি, আর আমাদের একান্ত মুহূর্ত। আমরা একমুখী সময়ের ভেতর দিয়ে সাঁতরে সাঁতরে চলে যাচ্ছি কোথায় যেন, আর মুহূর্তগুলো হিম হয়ে পড়ে থাকছে পিছনে, তুমি হারিয়ে যাচ্ছ, জমে যাচ্ছে সময়; আমি কিছুতেই সাঁতরে সাঁতরে পিছনে পৌঁছতে পারছি না, ধরতে পারছি না সেইসব মুহূর্তগুলো যখন আমরা পরস্পরকে স্পর্শ করে, পরস্পরের উষ্ণ নিঃশ্বাসে।

-----------------------------------------

এই ভ্রমণের জন্য কৃতজ্ঞতা: বন্ধু নীল চট্টোপাধ্যায়, তার স্ত্রী মৌ এবং তাদের দুই মেয়ে গোল্লু ও ছোটু; নীলের বন্ধু নন্দনদা ও জয়দা। এবং রাজার  সঙ্গে তাজপুর ভ্রমণসমূহে আমাদের সঙ্গের বন্ধুসকল ও পরিবারের সদস্যরা। 

-------------------- 

ছবি: লেখক, ইরমট্রড, সুকল্যাণ, নীল প্রমুখ। 

--------------------   

জানু ২৭-২৯_২০২২, তাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ  

      

                                                      দুনিয়ার সঙ্গে। শীতকাল, ২০১৯ 

তাজপুরে সূর্যাস্ত। শীতকাল, ২০১৯ 


নীল, সুকল্যাণ, মঞ্জুরি, মৃন্ময়ী, দুনিয়া, লেখক ও ইরমট্রডের সঙ্গে। শীতকাল, ২০১৯ 

তুমি। শীতকাল, ২০১৯


দুনিয়া, মৃন্ময়ী, মঞ্জুরি ও লেখকের সঙ্গে। শীতকাল, ২০১৯ 

মনীষা, সুমনা, মঞ্জুরি ও ইরমট্রডের সঙ্গে। শীতকাল, ২০১৫ 


আমরা। শীতকাল, ২০১৫ 


তুমি। শীতকাল, ২০১৫ 


মনীষা, সুমনা ও মঞ্জুরির সঙ্গে। শীত, ২০১৫ 


ইরমট্রড ও চালকের সঙ্গে। শীত, ২০১৫ 


ইরমট্রডের সঙ্গে। শীত, ২০১৫ 


নেচার ক্যাম্প। শীত, ২০২২ 
   

সৈকতে। শীত, ২০২২ 

 

    

    #RajaBiswas #Widow #Lonely #Silence #AfterDeath #Grief #Living&Dead #Life&Death #Memories #Togetherness #Couple #Single #KolkataWriting #BengaliWriting #Travel #TravelWriting #TajpurWestBengal #Tajpur #NatureCamp