ইদে বাড়ি ফেরা
মৌসুমী বিলকিস
আমি তাকে দেখে ফেলি লোকজনে ঠাঁসা বাসের ভেতর, যখন বাসটি যেতে চায় কোনও এক দূরের গ্রামের গন্তব্যে, আর সেই উদ্দেশ্যেই হাঁকাহাঁকি-লোক ডাকাডাকি, যদিও বাসে আর তিল ধারণের জায়গা নেই, তবু বাসটি অধিক যাত্রীর আশায় দাঁড়িয়েই থাকে ধর্মতলার টারমিনাসে।
বাসের সব সিট ভর্তি, ফলে লোকজনকে ঠেলেঠুলে দাঁড়ানোর একটা জায়গা সে করে নিয়েছে, আর তার ছোট একটা ব্যাগ যা ইতিমধ্যেই কমজোরি হয়ে পড়েছে, কোনওক্রমে জায়গা পেয়েছে যাত্রীদের মাথার ওপর ব্যাগ রাখার জায়গায়। সে পরে আছে ঘর মোছার ন্যাতা হওয়ার যোগ্য একটা লুঙি, লুঙিটা হাঁটুর কিছুটা নীচ অব্দি ঝুলে আছে আর পাছার কাছে দু একটি জায়গায় বেশ কিছু ছোট ছোট ছিদ্রও চোখে পড়ছে। সে পরে আছে অপেক্ষাকৃত ভাল হলেও সেই পুরনো রঙচটা এক গেঞ্জি আর তার মাথার উস্কোখুস্কো অনেকদিন ধরে তেল ও শ্যাম্পুহীন চুলে যেন তার জীবন লেখা হয়ে আছে।
কোনদিকেই ভ্রূক্ষেপ নেই ছেলেটির, পুরো বাসের যাত্রীরা তাকে দেখছে এমনভাবে যে সে যেন এক চিড়িয়াখানারই বাসিন্দা হওয়ার যোগ্য, তবু সে প্রাণপণে দাঁড়ানোর জায়গাটুকুতে লেগে থাকতে চায়ছে আঠার মতোই, যেন যতই ঠেলাঠেলি হোক সহযাত্রীদের সাধ্য নেই তাকে স্থানচ্যুত করার।
এইসব শতচ্ছিন্ন বিষয়ের মধ্যেও ছেলেটির মুখে লেগে আছে অদ্ভুত এক আনন্দ, সম্ভবত ইদে ঘরে ফিরতে পারার প্রশান্তি। এই প্রশান্ত আনন্দের ভেতরেও একটা সারল্য তার দুচোখ ছুঁয়ে। খসখসে ও রোদে ঝলসে যাওয়া ত্বকের ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া তার দুই বড় বড় চোখ এই অসম্ভব ভীড়ের ভেতর ঘোরাফেরা করে, সহযাত্রীদের বৈভবের সাজসজ্জা আর ঘামে গরমে অতিষ্ঠ মুখগুলোয় বুলিয়ে নেয় তার কৌতূহল।
আমি ছেলেটির নাম দিই রফিক, এখনও যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠেনি, তার অবয়বের প্রত্যক্ষ দৃশ্য জানান দিয়ে যায় সেকথাই।
ইতিমধ্যেই কন্ডাক্টর ভীড় ঠেলেঠুলে ভাড়া কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যদিও বাসটির নড়ন চড়নের কোনও উদ্যোগ এখন অব্দি দেখা যাচ্ছে না, আর ড্রাইভারকে কন্ডাক্টর গলা হাঁকিয়ে বলে নিচ্ছে আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে, এরপর আর বাস নেই, ফলে ইদে বাড়ি ফিরতে চাওয়া লোকজনকে এই বাসটিই ধরতে হবে যাতে ইদ শুরু হওয়ার আগেই ভোর ভোর গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে মানুষজন, কেননা সমস্ত ট্রেনই পরিযায়ী শ্রমিকদের ভীড়ে ভিড়াক্কার, যারা বছরভর অসংগঠিত শ্রমিকের কাজ করে এই ইদ-উল-ফিতরে বাড়ি ফেরার অবসর পেয়েছে এবং সমস্ত কষ্ট স্বীকার করেও সুদূর দক্ষিণ ভারত থেকে কয়েকদিন ট্রেন সফর করে শিয়ালদা বা হাওড়া স্টেশনে শেষমেশ পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে।
আপাতত
ধর্মতলা টারমিনাসে বাসের ভেতর ফিরে আসা যাক।
কন্ডাক্টর রফিকের কাছে এসে ভাড়া চায়, তার চাওয়ার মধ্যে থাকে একটা তাড়া, বাস ছাড়ার আগেই এতগুলো যাত্রীর ভাড়া নিয়ে নিতে হবে তাকে। ভাড়া না দিয়েই ভীড়ের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা যাত্রী স্যাট করে কোথাও নেমে যেতে পারে এবং সেই রিস্ক সে নিতে চায় না। কিন্তু ইদ-পূর্ব বাসের ভাড়ার কোনও নির্দিষ্ট সীমা কেউ বেঁধে দেয়নি, ফলে যে যত পারছে ভাড়া হাঁকাচ্ছে, যাত্রীরা দিয়েও দিচ্ছে। কিন্তু কন্ডাক্টর রফিকের কাছে ভাড়া চায়তেই একটা গোলমাল শুরু হয়।
রফিক:
হাজার টাকা দিতে পারবো ন্যা।
কন্ডাক্টর:
তা উঠেছিস কেনে, নেমে যা। কোত্থেকে যে চলে আসিস তোরা!
রফিক:
শুন শুন, অত টাকা নাই, কী করে দিব?
ক: দিতে
পারবি ন্যা তো কী কাজ করলি এদ্দিন ধরে?
র: তুমাকে
করতে হতোক আমার মতন কষ্ট, তাহালে…
ক: কী
বুলছিস তুই! সবাই কষ্টই করে।
র: চাঁদি ফাটা রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আগুনে পিচ গলাতে হলে বুঝত্যাক!
রফিক নিজের কষ্ট যেন বা ভাগ করে নিতে চায় মানুষজনের সঙ্গে, যেরকম চায় প্রত্যেকেই। তার কথার গ্রাম্য ভঙ্গী আর কষ্ট ভাগ করার অদম্য ইচ্ছে উপভোগ করে অনেকেই, কেউ কেউ হেসে ওঠে।
আমি ভাবার চেষ্টা করি চাঁদি ফাটা রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আগুনের তাপের ভেতর কাজ করার অভিজ্ঞতা। রফিককে দেখতে দেখতে তার পায়ের দিকে চোখ চলে যায়, সস্তার হাওয়াই চপ্পল পরা পায়ের গোড়ালির যেটুকু উন্মুক্ত তা বেশ শক্ত আর তাপে পুড়ে কালচে হয়ে উঠেছে। পিচ রাস্তায় কাজ চলার সময় শ্রমিকদের পায়ে পুরু করে জড়ানো পলিথিনের বা কালো পাতলা সাইকেলের টায়ারের ভেতরে থাকা হাওয়া ধরে রাখার গোলকটার মতো আবরণ দড়ি দিয়ে বাঁধা দেখেছি। রফিকও কি সেরকম করেই পা জড়িয়ে রাখে কাজের সময়? মনে মনে ‘আহা, উঁহু’ করে তার বেদনার শরিক হতে খুব লজ্জা বোধ হল। কিন্তু সদ্য পরিচিত এই বালকের জন্য একটা বেদনা বুকের ভেতর স্রোতের মতো বয়ে গেল ঠিকই।
(Courtesy: Buses and Bus Stop by Ini Brown)কন্ডাক্টর রফিককে ছেড়ে অন্যান্যদের ভাড়া কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার কথা শুনে রাগ না করে হেসে ফেলে সে। রফিকের কথার ভেতর এমন এক সারল্য আর নাছোড়বান্দা ভাব আছে যে লোকেরা না হেসে পারে না। কন্ডাক্টর আবার ফিরে আসে রফিকের কাছে।
ক: কষ্ট
করতিই হবে, কষ্ট না করলে কেষ্ট মিলবে কী করে রে ছোঁড়া?
রফিক এ কথার কোনও উত্তর খুঁজে পায় না।
ক: তা
এত কষ্ট করে কাজ করিস, টাকা তো ঠিকঠাকই পাস, নাকি?
র: বুললেই
হল টাকা ঠিকঠাক পাই! রাস্তার ঠিকেদার অত সহজ লয়! টাকা দেওয়ার সুময় যত ঝামেলা করে।
ক: ক’টাকা
পায়েছিস?
র: তা
তুমাকে বুলবো ক্যানে?
ক: বেশ
সিয়ানা আছিস তো!
কন্ডাক্টর
হেসে ওঠে।
র: সিয়ানা
না হলে সবাই ঠকিয়ে লেয় যে! এই দেখ, য’টাকা দিবে বুলেছিল তার আদ্ধেকও দেয়নি। ইদের লেগে
কিছু কিনতে পারিনি। টাকাগুলা কুনুরকমে বাড়ি লিয়ে যাছি, মাকে দিতে হবে। এই টাকা দিয়ে
সংসার চলবে যদ্দিন না নতুন কাজ পাই, আর টাকা আসার কুনু কিনারা নাই।
ক: তা
তোর বাপ কী করে?
র: বাপ
আবার সাদি-বিহে করেছে। আমাধেরকে দেখে না।
ক: তো
দে, যা পারবি দে।
র: নামিয়ে
দিবা না তো?
ক: না
না। লে, ভাড়া কাট। তোর সাথে বকবক করলে আমার চলবে না।
র: তালে ল্যাও…
একটা দুশো টাকার নোট রফিক এগিয়ে দেয়। কন্ডাক্টর রাগ না করলেও, সন্তুষ্ট হতেও পারে না।
ক: দেখ
দিকি ছোঁড়ার কাণ্ড! দুশো টাকা এতটা পথের ভাড়া হয় রে?
র: এই
লিলে ল্যাও, আমি আর পারবো না।
ক: আর
তিনশ দে।
র: বুলনু
যে, আর পারবো না।
ক: আচ্ছা,
তাহলে পরে দিস। তোর মোবাইল নং দিয়ে যা।
র: মুবাইল?
ও কুনঠে পাবো? আমার মুবাইল নাই।
ক: তোর
মতন জুয়ান ছুঁড়ার মোবাইল নাই? কি বলিস!
র: ক’মাস হল কাজ করা শুরু করেছি। চার, পাঁচ হাজার টাকা খরচ করবো ক্যানে? আর মাসে মাসে রিচাজ না কি করতে হয়। অনেক গ্যালান টাকা লাগে। কুত্থেকে পাবো? আমি বাংলা পড়তেই পারি ন্যা, আমার বন্ধুর কাছে দেখেছি, মুবাইলে সব ইংরাজি লিখা। আর আমার বাড়িতে কারেন নাই যে মুবাইল চলবে। চার্জ দিতে হয় যে।
ক: তুই
দেখছি একবারে আগের যুগের মানুষ! জামাকাপড়ই কিনিস না, মোবাইল কিনবি কেমন করে!
র: বুলো
বুলো, যত পার বুলো। আমার মুতন হলে দেখতে কত ধানে কত চাল! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাত আট ঘণ্টা
যাতে হবে, দুশ টাকায় হবে না ক্যানে?
ক: তুই
ঝগড়াও করতে পারিস!
র: হক
কথা বুললেই ঝগড়া হয়, না? ঘুম পাছে ভাই, এখুন আর কথা বুলতে ইচ্ছা করছে না। সেই তিনদিন
ধরে টেরেনে করে হাওড়া অব্দি আসেছি। এখুনও সাত আট ঘণ্টা… তারপর একঘণ্টা হেঁটে, খেয়াঘাট
পার হয়ে গেরাম। ইদের নামাজের আগে পহচাতে হবে।
ক: ঠিকাছে ঠিকাছে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে লে। পরের বার দুশ টাকায় হবে না, মনে রাখিস। পেটে দানাপানি কিছু পড়েছে? বলিস তো কিনে দিই কিছু?
এ কথার উত্তর দেয় না রফিক। কিন্তু আমি জানি, ওর পেটের ভেতর ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে, বার বার খাবার কিনে টাকা নষ্ট করতে সে পারেনি।
বাস ছেড়ে দেয়। শহরের নিয়ন আলো পেরিয়ে বাস এগোতে থাকে এক গণ্ড গাঁয়ের উদ্দেশে। রফিক বাসের দুলুনির মধ্যেই ভিড়ে চেপ্টে গিয়েও চোখ বন্ধ করার আগে বাঙ্কের ওপর রাখা তার মলিন ব্যাগটা দেখে নেয় একবার। তার চোখের তারায় ভেসে ওঠে মায়ের মুখ, বোনের মুখ। তপ্ত দুপুরে পিচের রাস্তায় দেখা মরীচিকার ভেতর তাদের ছোট্ট ঘরটা কাঁপতে থাকে, কাঁপতে কাঁপতে মিলিয়ে যায় কোথায়। চমকে ওঠে রফিক।
বাসটা
অন্ধকারের ভেতর হর্ন দিতে দিতে এগিয়ে যায় রফিকের গ্রামের কাছাকাছি, যে গ্রাম আমি কখনও দেখিনি,
যাইনি কখনও, আমি শুধু রফিকের মুখের ভেতর দেখে ফেলি আমার দেশেরই এক অচেনা জনপদ।
--------------------------------------------------


No comments:
Post a Comment