‘হিন্দু-মুসলমান বিয়ে হলে যে সব সমস্যা হয় তা করতে হয়েছিল আমার শ্বশুরমশাইকে৷
তিনি তো হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছিলেন, প্রমীলা দেবীকে৷’
নজরুলের অন্তরঙ্গ মূল্যায়ন৷ পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী, নাতি কাজী অনির্বাণ-এর
সঙ্গে আলাপে মৌসুমী বিলকিস
কল্যাণী কাজী: হিন্দু-মুসলমান
বিয়ে হলে যে সব সমস্যা হয় তা করতে হয়েছিল আমার শ্বশুরমশাইকে৷ তিনি তো হিন্দু মেয়ে বিয়ে
করেছিলেন, প্রমীলা দেবীকে৷ রক্ষণশীল সমাজ মেনে নেয়নি৷ মৈত্রেয়ী দেবীর লেখা পড়ছিলাম,
তিনি গিরিবালা দেবী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘মেয়ে প্রেম করবে হাত ধরে বেরিয়ে যাবে সেটা কোনও
ব্যাপার না৷ কিন্তু এক জন সহায় সম্বলহীন বিধবা সমাজকে উপেক্ষা করে, রক্ষণশীলতা থেকে
বেরিয়ে এসে নজরুলের সঙ্গে নিজের মেয়ে প্রমীলা দেবীর বিয়ে দিয়েছিলেন৷’
মৌসুমী বিলকিস: অসুস্থতার সময় আশ্রয়ও
তো দিয়েছিলেন…
কল্যাণী কাজী: আসলে যখন কবি ও
কবিপত্নী দু’জনেই অসুস্থ, তিনিই সামলেছেন৷ একা হাতে৷ তো যাই হোক, বাবাকে কঠোর বিরোধিতার
মুখে পড়তে হয়েছিল৷ মুসলিমরা তো ছিলই, হিন্দুরা এবং ব্রাহ্ম সমাজ একদম বয়কট করা যাকে
বলে, তা-ই করেছিল৷ বাবা সে সময় ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের কাছে আশীর্বাণী
চেয়ে পাঠিয়েছিলেন৷ সবাই ভেবেছিল যে রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম, আশীর্বাদ করবেন না৷ কিন্তু
রবীন্দ্রনাথ এই সংকীর্ণতায় জড়াননি৷
মৌসুমী: সজনীকান্ত দাস কবির
প্রবল বিরোধী ছিলেন৷
কল্যাণী কাজী: হ্যাঁ৷ বাবা নিজেই
বলেছেন, ‘ওরে বাবা, সে কী গালাগালি! যেন গালাগালির গালিচায় শাহেনশা হয়ে বসে আছে৷’ বাবাকে
দাবিয়ে রাখার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে৷ কিছুতেই আটকাতে না পেরে তাঁরা রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন
হয়েছিলেন, যে ‘আমরা তো আটকাতে পারছি না৷ নজরুল তো এগিয়েই চলেছে৷ আপনি এবার রোখার চেষ্টা
করুন৷’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কখনওই সে ধরনের কথায় কান দেননি৷ বরং বাবাকে উৎসাহ দিয়েছেন৷
বাবা ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়েছিলেন৷ আর আমি বাড়িতে। কাজেই বাবাকে তো সুস্থ আমি দেখিনি৷
উনি বাকরুদ্ধ হয়েছিলেন এবং স্মৃতি হারিয়েছিলেন৷ লোকে ভাবে, বোধ হয় কথাটথা বলতে পারতেন
না৷ কিন্তু তা নয়৷ তোর (কাজী অনির্বাণকে) দাদুর আগে মণি (প্রমিলা দেবী) অসুস্থ হয়ে
গিয়েছিলেন৷ কোমর থেকে নীচে অবধি পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন৷ একটা ছোটো চৌকিতে শুয়ে
থাকতেন।
কাজী অনির্বাণ: ওখানে শুয়েই রান্না
করতেন৷
কল্যাণী কাজী: সমস্ত সংসারের দিকে
খেয়াল রাখতেন৷ তোর দাদুকে খাইয়ে দিতেন৷ বাবা নিজে খেতে পারতেন৷ কিন্তু এত তাড়াতাড়ি
খেতেন যে গলায় মাছের কাঁটাটাটা বিঁধে যেতে পারত, তাই মা খাইয়ে দিতেন বাচ্চাদের মতো৷
বাবার সমস্ত কিছু বুঝতে পারতেন মা৷ গান শুনতে ইচ্ছে হলে হারমোনিয়ম দেখিয়ে গলা দিয়ে
একটা শব্দ বের করতেন বাবা৷ তখন গান শোনাতে হত৷ কত বার যে বাড়ি বদলেছেন৷ একটা ছোট্টো
বাড়ি, মানিকতলা স্ট্রিটে, মনে আছে৷
কাজী অনির্বাণ: বাড়ির নীচে খাটালও
ছিল৷ দাদু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারতেন না৷ কাঠের সিঁড়ি ছিল৷ জলও তুলতে হত ওপরে৷
কল্যাণী কাজী: সিঁড়ি দিয়ে উঠেই
একটা ছোট্টো দালান ছিল৷ দালানের এক দিকে যেটা বড়ো ঘর সেখানে তোর মণি দরজার দিকে মুখ
করে শুয়ে থাকতেন৷ উল্টো দিকের ঘরটাতে তোর দাদু আলাদা ভাবে থাকতেন৷ নিজের মনে থাকতেন৷
কখনও নিজের মতো হেসে যাচ্ছেন, কখনও জানলায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে হেসে
হেসে একটা অব্যক্ত ভাষায় কী যেন বলে যাচ্ছেন৷ খবরের কাগজ দেখতে খুব ভালোবাসতেন৷ কাগজটা
এমন ভাবে সামনে ধরতেন যেন সব খবর পড়ছেন৷ তার পর কাগজটা ধীরে ধীরে ভাঁজ করে রেখে দিতেন৷
যখন সুস্থ ছিলেন সকালে উঠেই কাগজ নিয়ে বাথরুমে চলে যেতেন৷ দুটো কাগজ নেওয়া হত৷ বাড়ির
মেয়েরা বাংলাটা পড়বে৷ বাবা ইংরেজি কাগজ পড়বেন৷
কাজী অনির্বাণ: আচ্ছা, একটা কথা
বলো, দাদুর গানকে তো প্রথম থেকেই নজরুলগীতি নামে...
কল্যাণী কাজী: না সে নামে প্রচারিত
হত না৷ বাংলা গান অনুরোধের আসরে হচ্ছে, রবীন্দ্র সঙ্গীত, অতুলপ্রসাদ… তার মধ্যে
‘ভালো বাংলা গান’ বলে প্রচারিত হত৷ তখন আমরা ভালো বাংলা গান শুনতাম৷ সেই হিসেবে যেমন
‘কাবেরী নদীজলে কে গো…’, সুপ্রভা সরকারের গাওয়া৷ এটা রাগপ্রধান গান৷ ‘নয়ন ভরা জল গো
তোমার…’, সত্য চৌধুরীর গাওয়া৷ এ রকম আর্টিস্টরা তখন তোমার দাদুর গান গাইতেন৷ কিন্তু
নজরুলগীতি বলে নয়৷ ষাটের দশকে ফিরোজা বেগম, কমল দাশগুপ্ত এঁরা ছিলেন, অনেকেই বাবাকে
গান শোনাতে আসতেন৷ কল্পতরু সেনগুপ্ত ছিলেন৷ তো তাঁরা ভাবলেন, আরে, গানে এত বৈচিত্র,
এত বৈশিষ্ট! এই গান আলাদা নামে পরিচিত হওয়া উচিত৷
কাজী অনির্বাণ: নজরুলগীতি নাম,
ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকেই, তাই তো? কারা ঠিক করলেন?
কল্যাণী কাজী: বোধ হয় ‘নজরুল জন্মজয়ন্তী’ নামে একটা সংস্থা বানিয়ে সরকারের কাছে অনেক লেখালেখি করে ওঁরা এই নাম আদায় করেছিলেন৷
মৌসুমী: রবীন্দ্রসঙ্গীতের
বাঁধা নিয়মে যেমন বিশ্বভারতী কড়া নজর রেখেছিল, নজরুলের গানের ক্ষেত্রে সে রকম হয়নি৷
তার ফলাফল কী হল?
কল্যাণী কাজী: বাবার গানকে যখন
নজরুলগীতি বলা শুরু হল তখন চাল বাছার মতো গান খোঁজা হচ্ছে৷ রেকর্ডে…
কাজী অনির্বাণ: আসলে নাম লেখা থাকত
না৷
কল্যাণী কাজী: গীতিকার, সুরকারের নাম পাওয়া যেত না৷ শুধু শিল্পীর নাম দিয়ে বের করে দিত৷ মাত্র দেড়শো/ দু’শো গান পাওয়া গেল৷ যেখানে তিন হাজারের বেশি গান রয়েছে… নজরুলগীতি নামে আলাদা করে যখন বাবার গান পরিচিতি পেল তখন গানের চাহিদাও হঠাৎ বেড়ে গেল৷ কথা হল যে, সংরক্ষণের বিষয়ে বাবার আশেপাশের কেউই উদ্যোগ নেয়নি৷ আর আমার মনে হয় বাবার প্রচুর গান হারিয়েও গেছে৷ তিনটে স্বরলিপির বই তিনি প্রকাশ করতে পেরেছিলেন৷ ‘সুরলিপি’, ‘সুরমুকুর’ আর ‘নজরুল স্বরলিপি’৷ একটা তিনি নিজে বের করেছিলেন আর বাকি দুটো তাঁর সহযোগী যাঁরা ছিলেন, নিতাই ঘটক চেষ্টা করেছিলেন৷ কত কী যে করেছেন, তিনিই প্রথম কবি যিনি পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেছিলেন৷ শুধু ‘বাগিচায় বুলবুলি’ আর ‘বিদ্রোহী’ লিখলেই তিনি স্বীকৃতি পেতেন৷ কিন্তু বাবার উদারতা এমনই ছিল যে হয়তো কমল দাশগুপ্ত বাবার গানে একটা সুর দিয়ে বাবাকে শোনালেন৷ তখন বাবা বললেন, বেশ সুন্দর হয়েছে৷ এটাই থাকবে৷ তখন বাবার অনুমোদন ছিল৷ সেই রাস্তা ধরে পরবর্তীকালে, যখন নজরুলগীতির খুব চাহিদা বাড়ছে তখন অনেকে করলেন কী, সুর না পেয়ে বাবার গানের কথায় নিজেরা সুর দিতে শুরু করলেন৷ একে একে অনেকেই এ ভাবে বাবার গানে সুর দিয়ে গাইতে থাকলেন৷ এ ভাবেই বাবার গানে সুরের বিকৃতি শুরু হল৷ আসল সুর মানুষ চিনলই না৷
মৌসুমী: নজরুল নিজে যে সব
গানের সুর দিয়েছিলেন সেগুলোও কি পরবর্তী কালে বিকৃত হয়নি?
কল্যাণী কাজী: হয়েছে তো৷ আমাদের
সঙ্গে বর্তমানে ক্ল্যাশ হচ্ছে বাংলাদেশের৷ কেন? না ওরা ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ করেছে৷ ওরা
পুরোনো রেকর্ড থেকে প্রামাণ্যকরণের চেষ্টা করল যে এটাই অরিজিনাল সুর৷ ও দেশে এ ভাবেই
গাওয়া হচ্ছে৷ দেখবে দু’দেশের শিল্পীদের মধ্যে একটা সুর-বিতর্ক আছে৷ কাজী অনিরুদ্ধও
অনেক গানের স্বরলিপি করেছেন৷ তখনকার যে সব শিল্পীদের নিয়ে নজরুল ইসলামকে কাজ করতে হয়েছে
তাঁরা, যেমন আঙ্গুরবালা দেবী, ইন্দুবালা দেবী, ওঁদের সুর হয়তো ঠিক আছে৷ কিন্তু গায়কি
আলাদা ছিল৷ আগে একটা আলাপ দিতে হত৷ পরবর্তীতে যুগের সঙ্গে তাল রেখে মেলডি আনা হল৷ তাঁরা
খুব কায়দা করে গাইছেন ঠিকই৷ কিন্তু কায়দার গান গাইতে গেলে গায়কি ঠিক রাখতে হয়৷ কিন্তু
সবার গলায় আসে না সেগুলো৷ তো ওরা অরিজিনাল অনেক সুর বের করেছে রেকর্ড থেকে৷ আমিও ওদের
থেকে সেই সব সুর শিখে এখানে (কলকাতায়) গেয়েছি৷ ভালো সুর৷ সবাইকে বলেছি আসল সুরটা তুলে
নিতে৷ কিন্তু কী হয়, এক বার কোনও গানের সুর মাথায় বসে গেলে তা ইরেজ করা খুব মুশকিল৷
তা ছাড়া গানের সমস্যা হল, কোনও একটা সুর জনপ্রিয় হয়ে গেলে আসল সুরটা আর কেউ নিতে চায়
না৷ আসল সুরটা তো প্রতিষ্ঠিত করতে হবে৷ গেয়ে গেয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷ সুরান্তর রইল৷
তোমার যেটা ভালো লাগে তুমি গাও৷ কিন্তু নতুন করে বিকৃতি এখানে এখন কিছুটা বন্ধ হয়েছে৷
আগে যে শিল্পীরা গান করতেন, যেমন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়৷ তিনি প্রথম দিকে যে গানগুলো
গাইতেন সেগুলোর মধ্যে নজরুলকে পাওয়া যেত৷ কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নিজের মতো করে গাইতেন৷
আমার স্বামী কাজী অনিরুদ্ধ তাঁর বন্ধু ছিলেন৷ তিনি তাঁকে বলতেন, মানব-গীতি করিস না৷
নজরুলের গান জানিস তো, আমজনতার জন্য৷ অনিরুদ্ধ বলতেন রবীন্দ্রনাথের গান সফিস্টিকেটেড…
আর নজরুলের গান গাড়োয়ান থেকে বিড়িওয়ালা, সবার মুখে...
মৌসুমী: তাঁকে বাংলাদেশে
যেতে হল? বিশেষ কোনও কারণ?
কাজী অনির্বাণ: আমি তখন অনেক ছোটো
ছিলাম৷ মুজিবর রহমান ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করেছিলেন কবিকে যেন স্বাধীন বাংলাদেশে
নিয়ে যেতে পারেন৷ সেই উদ্দেশ্যেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ তাঁকে জাতীয় কবি ঘোষণারও কথা ছিল৷
তার পর ওঁর আর ফেরত আসা হল না৷ মা পৌঁছনোর আগেই দাদুকে কবরস্থ করা হয়েছিল৷ কিন্তু আমার
মনে হয় ওখানে দাদুকে খুব ভালোই রেখেছিল ওঁরা৷ ও পার বাংলায় দাদুকে অনেক সম্মান করা
হয়৷ এ পারেও সম্মান করে৷ কিন্তু তখনকার সরকার কিছু করেনি দাদুর জন্য৷
মৌসুমী: পশ্চিমবঙ্গে নজরুল
চর্চা কি যথেষ্ট হয়?
কাজী অনির্বাণ: বাংলাদেশে বেশি
দাদুকে নিয়ে চর্চা হয়৷ পশ্চিমবঙ্গে দাদুকে সবাই ভালোবাসে, কিন্তু সে ভাবে তাঁকে নিয়ে
কিছু কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না৷ আমাদের খুব ভালো লাগে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘নজরুল
তীর্থ’ করেছেন...
কল্যাণী কাজী: একাডেমি করেছেন৷
কাজী অনির্বাণ: হ্যাঁ, কিন্তু দাদুকে
নিয়ে যে রিসার্চ হওয়া দরকার, সেগুলো হচ্ছে না এখনও৷
**এই সময়, রবিবারোয়াড়ি-তে প্রকাশিত। মে, ২০১৫। আজ কল্যাণী কাজীর মৃত্যুতে লেখাটি পুন:প্রকাশিত হল।



No comments:
Post a Comment