একদিন মৃত্যু
মৌসুমী বিলকিস
রাজা বিশ্বাস (২৮ ডিসেম্বর, ১৯৭৪- ৩০ নভেম্বর, ২০২০)
ইন্সটিটিউট অফ নিউরো সায়েন্সেস (মল্লিক বাজার)-এ শেষ বিছানায় তুমি শুয়ে।
তোমার কাছে যাওয়ার জন্য সবাই বলছে আমাকে। যাব না, কিছুতেই যাব না। এ তুমি সে তুমি নও যাকে আমি দেখতে চাই। 30 নভেম্বর রাত 9.55 তে সে তুমি চলে গেছ, চিরদিনের মতো, যে তুমিকে জড়িয়ে ছিল আমার সবকিছুই, ভাল এবং মন্দও।
তোমার দেহ কিছুতেই নিষ্প্রয়োজনের ছাই হয়ে যেতে পারে না, প্রবল শোকের ভেতর মনে পড়ে যায় আমার। আমরা দল বেঁধে গণদর্পণে নাম লেখাবো, মরণোত্তর দেহদানের বিষয়ে আগেই কতবার কথা বলেছি, কিন্তু কখনও সে উদ্যোগ নেওয়া হয়ে ওঠেনি। ইচ্ছেটা এক বন্ধুকে জানালাম, কাঁদতে কাঁদতেই। তিনি উদ্যোগ নিলেন।
কিন্তু তোমার তথাকথিত গণ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ‘বিপ্লবী’ বন্ধুদের কয়েকজন ছাড়া কেউই আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন না। তোমার বাড়ির লোকেদের একজন হসপিটালের বাইরে দাঁড়িয়েই আমাকে যা-ইচ্ছে-তাই বলতে শুরু করলেন, আর কেউ কেউ খুব ভদ্রভাবেই আপত্তির কথা জানালেন। তোমার বাড়ির মানুষেরা কেউ কখনও তোমার মতো গণ সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন না। ফলে তাঁদের আপত্তিটা বুঝতে আমার কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু তুমি যাদের সঙ্গে এতদিন সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেছো তাঁদের আসল ‘বিপ্লবী’ রূপ আমার কাছে ধীরে ধীরে খুব নগ্নভাবেই প্রকাশিত হয়ে পড়লো, তোমার মৃত্যুর পর, এবং আমি খুব ভাল করেই জানি তুমি বেঁচে থাকলে আমার প্রতি এঁদের এই ধ্যাস্টামো এক ফোঁটা সহ্য করতে না।
শেষমেশ তোমার কর্নিয়া দুটো দান করা গেল (দিশা আই হসপিটাল থেকে লোক এসে নিয়ে গেল তোমার কর্নিয়া যা দিয়ে তোমার মতো করেই কেউ পৃথিবীর আলো দেখছে, জীবন্ত হয়ে আছো তুমি), সে বিষয়ে তোমার বাড়ির মানুষেরা একমত হলেন বলে। তোমার মায়ের সম্মতি থাকায় মরণোত্তর দেহদানের বিষয়ে আর কারোর আপত্তি খাটলো না। কিন্তু কিছু বন্ধু অনেক চেষ্টা করার পরেও করোনা সংকটের কারণে কোথাও দেহ দান করা গেল না। সেই শ্মশানেই ছাই হয়ে গেলে তুমি।
এই পুরো প্রসেসটাতে হসপিটালের কর্মীরা এবং ডাক্তাররা খুব সাহায্য করলেন।
কিছুক্ষণ আগেই হসপিটাল থেকে ফিরেছি। তোমার মৃত্যুর খবর পেয়েই আবার হসপিটালে দৌড়েছি, আমাদের প্রিয় বন্ধু বনমালী আর ছোটবোন মনীষার সঙ্গে। তার আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, যখন একটা ট্যাক্সিও পাচ্ছি না, তিনজন পরস্পরকে জড়িয়ে প্রবল কাঁদছি। সবাই দেখছে জানি। কিন্তু কী করে আমরা সামলে রাখবো নিজেদের?
খুব অসুস্থ লাগছে। হসপিটালে পৌঁছে বমি করছি আর কাঁদছি। কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। কত পরে স্থির হতে পারলাম কিছুটা। আমাকে বন্ধু ও বাড়ির লোকেরা ধরে ধরে বসিয়ে দিয়েছেন একটা চেয়ারে। নিঃশব্দে কাঁদছি তখনও। ফারহা, ঝুম্পা, আমার ভাইবোন অনেক বলে অনুমতি পেয়ে হসপিটালের ভেতর ঢুকতে পেরেছে। আমাকে ঘিরে আছে সবাই। বাকিরা বাইরে অপেক্ষা করছে।
তোমাকে দেখতে যাওয়ার অনুরোধ এতক্ষণ ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। কী করে দেখবো তোমার ওই শীতল হয়ে যাওয়া শরীর? কিন্তু এক সময় মনে হল কর্ণিয়া দুটো নিয়ে যাওয়ার আগে দেখে আসি তোমায়। এই করোনা আবহে একদিনও তোমার কাছ অব্দি আমি যেতে পারিনি, কেউ যেতে পারেনি। একা একাই কোমার ভেতর আচ্ছন্ন হয়ে ছিলে তুমি।
অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম বলে ছোট বোনকে আমার সঙ্গে তোমার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিল হসপিটাল।
‘কেমন দিলাম, মৌসুমী’ মুখ করে আইসিইউ-তে শুয়ে আছো তুমি। কর্মী ছেলেটির অনুমতি নিয়ে তোমাকে স্পর্শ করছি, ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছি তোমার কপালে, গালে গাল। তখনও তোমার নাকে, গলায় নল, তখনও খানিক উষ্ণ হয়েই আছো তুমি। ওরা বললো চার ঘন্টা পর সব খুলে দেবে, নলও।
তোমার শয্যার পাশে নিথর দাঁড়াই কিছুক্ষণ।
তোমার হাতের পাতাদুটি বরফের মতো শীতল। পাতা থেকে কনুইয়ের দিকে হাত বোলাচ্ছি। কী উষ্ণ! যেন এক্ষুনি উঠে বসে আমাকে দু হাতে জড়িয়ে বুকে টেনে নিয়ে বলবে, ‘মৌ, জানতাম তোমার অভিমান ভাঙবে। আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না।’
হাতের নখগুলো খুঁটিয়ে দেখছি। এত পরিষ্কার করেও রেখেছো? আগে কখনও তো দেখিনি! আমি তোমার কাছে আসবো বলেই বুঝি?
তোমার বাইপাস সার্জারির সময় কেটে নেওয়া শিরার ক্ষতর ওপর আমার হাত স্তব্ধ হয়ে আছে। অনন্তকাল পড়ে থাকতে চায়ছে এখানেই। পায়ের তালু এত পরিষ্কার ধবধব করছে! তোমার পায়ের নীচ সম্পর্কে এটা কখনও ভাবা যায়? সেখানে সারাক্ষণ লেপ্টে থাকে এই শহরের ধুলোকাদা। শহরের বস্তি আর ফুটপাথের যাবতীয় নির্যাস। এমনকি বন্যা কবলিত মালদা-মুর্শিদাবাদ, আমপান বিদ্ধস্ত সুন্দরবন, লকডাউনে কাজ হারানো মানুষের বাড়িঘরের ধুলো। এসব তোমার পায়ের নীচে থাকবে না তা কি হয়?
আমার ঘরের বিছানায় উঠে বসার আগে বাথরুমে ভাল করে পা ধুয়ে এলে। তারপরেও পায়ের নীচে ধুলোমাটির স্পর্শ পুরু হয়ে আছে যেন বা তোমার ত্বকেরই অংশ।
নিথর পা দুটো ঢেকে দিই সাদা কভার লাগানো কম্বলে। ছোট
বোন ওকে চুমু খাওয়ার জন্য আমার অনুমতি চায়।
কী যে বলিস! ওকে চুমু খাওয়ার আগে তোর অনুমতিই নেওয়া উচিত ছিল আমার। আমার ছোট বোন হলেও তোমার কত আদরের সেই ছোটবেলা থেকে যখন সে প্রায় শিশু, মাকে ছেড়ে সদ্য এসেছে এই শহরে পড়াশোনা করতে তখন থেকেই তুমি ওকে আঁকড়ে থেকেছো, আমার থেকেও বেশি ওর সুখ দুঃখের সামিল হয়েছো। ওকে আমরা দুজনে নিজের সন্তানের মতো স্পর্শ করে থেকেছি সব সময়। আমাদের নিজের সন্ততি না হওয়ার সিদ্ধান্ত সেই কবেই নিয়েছি, বিয়ের আগেই। নিজের সন্ততি মানুষ যেভাবে ছুঁয়ে থাকে সেভাবেই বোন আমাদের দুজনের হয়ে উঠেছে। ও তোমাকে শেষ চুমু খাবে না তা কি হতে পারে?
এই তো লকডাউনের ভেতর যখন বন্ধ সব যানবাহন আর ছোট বোন অসম্ভব ডিপ্রেশনে, পরিচিত অটো ভাড়া করে সেই কলকাতা উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় উড়ে এসে তুমিই ওকে জড়িয়ে নিলে বুকে। তারপর আগলে রাখলে সারাক্ষণ।
এখন একটুও কাঁদছে না ছোট বোন, আমিও। আইসিইউ এর ভেতর কাঁদতে নেই। কান্নাহীন আদর আইসিইউ কর্মীরা বুঝি কখনও দেখেননি। ওঁরা ভীড় করে দেখছেন।
ছোট বোন অ্যাটেনডেন্টকে পর্দাটা টেনে দিতে বলে। নীল পোশাকের ছেলেটি টেনে দিতে থাকে সাদা পর্দার আড়াল যেন বা সে পর্দা দীর্ঘ হতে হতে আমাদের মাঝখানে এঁকে দেবে চির বিচ্ছেদ।
তোমার দু চোখের পাতায় ঠোঁট স্পর্শ করছি। তোমার বাঁ চোখ থেকে বেরিয়ে আসছে এক ফোঁটা জল। চির বিচ্ছেদের বেদনা তুমি এভাবেই বুঝি জমিয়ে রেখেছিলে। আমি যত্নে মুছিয়ে দিলাম সেই অশ্রু।
বেদনা রেখ না প্লিজ। আমাদের আস্তিনে জমানো কত সূর্যকরোজ্জল দিন। সেসব মনে করে কাটিয়ে দেওয়া যায় এক জীবন। কিন্তু যারা বেঁচে থাকে তারা কি পারবে, বেদনাহীন বেঁচে থাকতে? না, পারছি না। দু বছর পরেও কান্নাগুলো বুক ঠেলে উপচে আসছে ক্ষণে ক্ষণে।
জানি, আমার অনুরোধ শুনতে পাচ্ছ না, স্পর্শ করতে পারছো না অনুভব। তোমার শরীর এখন শুধুই দৃশ্য। সেই দৃশ্য আঁকড়ে ধরছি যা কিছুক্ষণ পরে চিরদিনের মতো হারিয়ে যাবে।
তোমার বাঁ চোখ থেকে নেমে আসা এক ফোঁটা অশ্রু ছুঁয়ে তোমাকে আদর করছি। এই প্রথম বারের মতো সে আদর বুমেরাং হয়ে ফিরছে আমার কাছেই।
তোমার মৃত্যুর পর এই রুক্ষ শহরের আনাচে কানাচে লাল হয়ে ফুটে আছে শিমূল, পলাশ, কোথাও কোথাও থোকা থোকা অশোক। কি নিষ্ঠুর মনে হতে থাকে প্রকৃতিকে! জানি, প্রকৃতির কাছে এই মৃত্যু খুব সামান্য ঘটনা, আবহমান জুড়ে ঘটে যাওয়া তুচ্ছ এক বাস্তব। তাকে ফিরতেই হবে জীবনের স্রোতে। জানি, তথাগতর কাছে এক মুঠো শস্য আমি নিয়ে যেতে পারবো না, তোমাকে বাঁচিয়ে তোলার আশায়, কেননা সেই শস্যদানা হতে হবে যে বাড়িতে কেউ কোনদিন মারা যায়নি, সে বাড়ির। তেমন বাড়ি কোথায় পাবো, তথাগত?
আবার ফিরে যাই শায়িত তোমার মুখোমুখি। তোমার নিথর মুখ জুড়ে আমার আঙুল ঘোরাফেরা করে। এই মুখ, আর কোনোদিন, কোনদিন ফিরবে না, রক্ত মাংসের হয়ে।
বাষ্পে ভেজা চোখ, নিয়ন্ত্রণ করি, প্রাণপণে।
-----------------------------------------------------


এ অন্য মৌসুমীকে পেলাম, যেখানে বিপ্লবের ভিতর জেগে আছে এক রক্তমাংসের আবেগতাড়িত নারীর কান্না, যে কান্নাকে ছোঁয়া যায়না, অনুভব করা যায় মাত্র। ভালো থেকো বন্ধু।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ, মরমী পাঠক ও বন্ধু।
ReplyDelete